প্রবাসে থাকা মানেই কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব নয়—এটা এক ধরনের মানসিক বিচ্ছিন্নতাও। নতুন শহর, নতুন নিয়ম, নতুন বাস্তবতার ভিড়ে হঠাৎ করেই মনে হয়, নিজের মানুষগুলো কোথায়? ঠিক সেই প্রশ্ন থেকেই আমার সিঙ্গাপুরের ক্যাডেট কলেজ কমিউনিটির গল্পের শুরু।
সিঙ্গাপুরে ক্যাডেট কলেজের একটি বড় কমিউনিটি আজ দৃশ্যমান হলেও, এই যাত্রার সূচনালগ্নে যে নামটি আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়, সে নুরুন্নবী, যাকে আমরা সংক্ষেপে শুধু নবী বলেই ডাকতাম। নবী আমার ক্যাডেট কলেজের বন্ধু, পেশাগতভাবে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত, মূলত সামরিক বাহিনীর একজন অ্যাটাচড অফিসার। নবীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের চেয়েও গভীর—আড্ডা, ভাবনা, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে কথোপকথনে ভরপুর। একদিন জুমার নামাজ শেষে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই মনে হলো—সিঙ্গাপুরে তো অনেক এক্স-ক্যাডেট আছেন, আমরা যদি মাঝেমধ্যে একত্রিত হই, কেমন হয়?
এই সাধারণ ভাবনাটাই ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত উদ্যোগে রূপ নিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আগে খুঁজে বের করতে হবে মানুষগুলোকে। আমি গুগল স্প্রেডশিটে তথ্য সংগ্রহ শুরু করলাম, নবী তার পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাম-ঠিকানা জোগাড় করল। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ত্রিশজন এক্স-ক্যাডেটের সঙ্গে আমাদের সংযোগ তৈরি হলো। তখনই বুঝলাম—এটা কেবল একটি আড্ডা নয়, এটি একটি কমিউনিটির বীজ।
প্রথম গ্যাদারিং হলো ইস্ট কোস্টে। সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হলো, সঙ্গে যুক্ত হলেন সিঙ্গাপুরে থাকা কিছু সংগীতশিল্পী। সিনিয়রদের উপস্থিতি আমাদের সাহস বাড়াল—এরশাদ ভাই, বাতেন ভাই, ডিটো ভাই, জহির ভাই, মুনির সহ অনেকেই নানা দিক থেকে সহযোগিতা করলেন। নবীর উদ্যোগে দিন-তারিখ নিয়ে যত দ্বিধাই থাকুক, শেষ পর্যন্ত সেই দিনটি স্মরণীয় হয়ে রইল। বিশেষ করে নবী যখন ক্যাডেট কলেজের ড্রেস পরে তার দুই ছেলেকে আমাদের সামনে নিয়ে এলো—সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, এই বন্ধন প্রজন্ম পেরিয়ে যায়।
এরপর ধীরে ধীরে কমিউনিটি বিস্তৃত হলো। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি হলো, মানুষ আসলো, কেউ কেউ চলে গেল—তবু সংযোগ রয়ে গেল। নবী চলে যাওয়ার আগে বিদায় সংবর্ধনা, তারপরে হট পার্কে দ্বিতীয় মিলনমেলা।
এই আয়োজনের নেপথ্যে আরেকজনের নাম না বললেই নয়—আমার সহধর্মিণী মিতু। বাংলাদেশে পারিবারিক পিকনিক আয়োজনের অভিজ্ঞতা থেকে সংগঠনের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সে নিপুণভাবে সামলেছে। খেলাধুলা, ছোটখাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছিল আন্তরিক।
তৃতীয় গ্যাদারিং আবার ইস্ট কোস্টে, এবার বারবিকিউ পিট ভাড়া করে আমরা আয়োজন করেছিলাম। আয়োজনের বেশা অনেক ঝক্কি ঝামেলা বাতেন ভাই সামলেছে। শিশুদের খেলার ব্যবস্থা, গান, উপহার—করোনার পর প্রথম বড় আড্ডা হওয়ায় মাস্ক পর্যন্ত উপহার হিসেবে রাখা হয়েছিল। আয়োজকদের মধ্যে সংযুক্ত হল মুনির, মেহেদী সহ অনেকেই। অনুষ্ঠান শেষে সবাই মিলে সোলস এর গানগুলি গাইছিলাম। প্রাণ জুড়ে গিয়েছিল আমাদের সবার। আমরা সবাই ফিরে গিয়েছিলাম ক্যাডেট কলেজের শৈশবে।
চতুর্থ গ্যাদারিং আরও বড় পরিসরে—মালয়েশিয়ার জোহর বারুতে। এখানে নেতৃত্ব নিল আমারই এক ব্যাচমেট মিজান। আমরা সবাই মিলে গড়ে তুললাম একটা আয়োজক স্বেচ্ছাসেবী দল। নতুন নেতৃত্ব তৈরির এই চেষ্টাটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া—দুই দেশের ক্যাডেটদের মিলিত উপস্থিতিতে সেই অনুষ্ঠান সত্যিই এক মিলনমেলায় রূপ নেয়। দুইদিনের প্রোগ্রাম আমাদের, রাতে সবাই মিলে বাহিরে বসে আড্ডায় মনে হয়েছিল কলেজের সেই কৈশরে ফিরে গিয়েছিলাম।
এই বড় আয়োজনগুলোর বাইরেও আমাদের ছোট ছোট দেখা-সাক্ষাৎ চলমান আছে। কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ ট্রানজিটে কিংবা সিঙ্গাপুরে বেড়াতে এলে—কখনো কফির আড্ডা, কখনো মোস্তফার আশেপাশে আড্ডা।
আমাদের এই সংগঠনের কোনো আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন নেই, নেই জটিল নিয়মকানুন। হৃদয়ের টানেই এই কমিউনিটি টিকে আছে।
এখানে একটি বড় প্রেক্ষাপট মনে রাখা জরুরি। বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৮ কোটির বেশি মানুষ আজ প্রবাসে বসবাস করছে—যা মোট বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৩.৫ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবাসে থাকা মানুষের মধ্যে যারা শক্ত সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে, তাদের মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা ৩০–৪০ শতাংশ বেশি। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ আদিমকাল থেকেই টিকে থাকার জন্য সমাজবদ্ধ হয়েছে—এই সামাজিক বন্ধনই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
সিঙ্গাপুরের ক্যাডেট কলেজ কমিউনিটিও সেই প্রাচীন মানবিক প্রবৃত্তিরই আধুনিক রূপ। কৈশোরে ক্যাডেট কলেজে যে শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা আর ঐক্যের শিক্ষা পেয়েছিলাম, প্রবাসে এসে তা নতুন করে আবিষ্কার করেছি। অন্যের মাঝে নিজেকে খুঁজে পাওয়া, প্রবাসের ভেতরে বাংলাদেশকে অনুভব করা—এই অনুভূতিই আমাদের একত্রে বেঁধে রাখে।