আলোচনা অনুষ্ঠান: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভবিষ্যত বিশ্ব
তারিখ: ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
আয়োজক:

এই আলোচনা অনুষ্ঠানে ড. মশিউর রহমান এর বক্তব্য এর সংক্ষীপ্ত রূপ:
আজকের আলচ্য বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চারদিকে এখন প্রবল আগ্রহ। কেউ কেউ এটি নিয়ে ভীত বা সন্দিহান, আবার অনেকেই উৎসাহী ও ইতিবাচক। কারো মত, AI কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না; আবার কেউ বলছেন, এখন না নিলে পরে আমরা পিছিয়েও পড়তে পারি। আমার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট – সন্দেহ নেই, আজ না হোক কাল আমাদের জীবনের নানা দিক কোনো না কোনোভাবে AI-এর দ্বারা প্রভাবিত হবেই। চাই বা না চাই, অন্যান্য বড় প্রযুক্তির মতো এটাকেও এক সময় গ্রহণ করতে হবে এবং নিজের প্রয়োজন ও বিবেচনা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
একটা উদাহরণ দিই গণমাধ্যমের জগত থেকে। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অনেক অভিজ্ঞ সম্পাদক এবং সাংবাদিকরা প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যমকে (ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদি) বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাননি। তাঁদের মনে হয়েছিল, ফেসবুক-ইউটিউবের খোলা মঞ্চে যে যা খুশি প্রকাশ করছে, সেখানে মান নিয়ন্ত্রণের বালাই নেই — সেটি কখনো মূলধারার মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার বিকল্প হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে মূলধারার গণমাধ্যমকেও শেষপর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমকে মেনে নিতে হয়েছে। এখন প্রায় সব টিভি চ্যানেল ও পত্রিকা নিজেদের খবর ও অনুষ্ঠান ফেসবুক-ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দিচ্ছে, লাইভ সম্প্রচার করছে। অর্থাৎ গণমাধ্যম চাইলেও সামাজিক মাধ্যমের জোয়ার উপেক্ষা করে চলতে পারেনি।
ঠিক তেমনটাই ঘটবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও। ব্যক্তি বা জাতি হিসেবে চাইলেও AI-এর অগ্রযাত্রাকে উপেক্ষা করে চলা সম্ভব হবে না। শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে এটিকে গ্রহণ করতে হবে এবং নিজের প্রয়োজন ও বিবেচনায় এর ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ শিখতে হবে।
এবার বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসি — কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জন্য কী সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। অনেকেই মনে করেন উন্নয়নের জন্য একটি দেশের পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো বা জনবল থাকা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বের অনেক দেশ (যেমন ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর) নিজস্ব তেমন প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকলেও জ্ঞান, শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে ভিত্তি করে উন্নতির শিখরে পৌঁছে গেছে।
আমার মতে, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশকে এক বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্ব বহু দশক ধরে বিপুল অর্থ ও গবেষণা প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যেসব অগ্রগতি অর্জন করেছে, এখন AI প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে সেই জ্ঞান আমরা ঘরে বসেই পেয়ে যেতে পারি। উদাহরণ হিসেবে চ্যাটজিপিটি-র কথা বলা যায়, যেটি আসলে একটি শক্তিশালী লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM)। এর মাধ্যমে আমরা নানা জটিল প্রশ্নের উত্তর এবং আধুনিক জ্ঞান সহজেই হাতের মুঠোয় পাচ্ছি।

এখানে একটু পটভূমি ব্যাখ্যা করি: যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বে ১৯৭০-এর দশক থেকে ভাষাভিত্তিক বড় বড় মডেল (Large Language Model বা LLM) নিয়ে কাজ শুরু হয়, বিশেষ করে ১৯৮০-এর পর এর উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটে। এসব উন্নয়নে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে; শুরুর দিকে ইংরেজি ভাষাকেই কেন্দ্র করে গবেষণা হয়। এত প্রচেষ্টার পর এখন উৎকৃষ্ট LLM মডেলগুলো আমাদের হাতে এসেছে, এবং সেগুলোর অনেক কিছুই উন্মুক্ত উৎস (open source) হিসেবে সবার ব্যবহারের জন্য মুক্ত। একটি দেশ যদি নিজস্ব LLM তৈরি করতে চায়, ধরে নিন প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার খরচ লাগবে; অথচ বাংলাদেশ সেই পথে বিনিয়োগ না করেও বিদেশে তৈরি প্রযুক্তি গ্রহণ করে সুফল পেতে পারে।
এই বিষয়টা বোঝাতে মজা করে একটা উদাহরণ দিয়েছিলাম। ধরুন, কোনো বড় অনুষ্ঠানে আয়োজকরা বিরাট বিনিয়োগ করলেন এবং প্রচুর লোকসমাগম হলো। সেই অনুষ্ঠানের বাইরে যদি এক বাদামওয়ালা বা মুড়িওয়ালা সামান্য পুঁজি নিয়ে খাবার বিক্রি করতে বসেন, তিনি খুব অল্প পরিশ্রমেই ভালোমতো লাভ করে নিতে পারবেন। কারণ মূল ইভেন্টে মানুষ এসেছে, বড় বিনিয়োগ অন্যরা করেছে, আর তিনি শুধু সুযোগটা কাজে লাগিয়ে মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। একইভাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পেছনে বড় বিনিয়োগটা অন্য দেশগুলো করেছে; আর আমরা এখন সুচতুরভাবে সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের উন্নতি সাধন করতে পারি। (বাংলাদেশকে “মুড়িওয়ালা” বলে খাটো করছি না, বিষয়টি বোঝানোর জন্য শুধু উদাহরণ হিসেবে বললাম।)
আমি জোর দিয়ে বলেছিলাম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বেশিরভাগ সাফল্যের ভিত্তি এই লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ও গভীর শিক্ষণ (ডিপ লার্নিং) প্রযুক্তি। অবশ্য এখন আরও নানা ধরনের মেশিন লার্নিং পদ্ধতি আসছে — এক সময় ছিল তুলনামূলক সরল “শ্যালো লার্নিং”, আর এখন চলছে উন্নত “ডিপ লার্নিং”; সামনে আরও নিত্যনতুন পদ্ধতি আসবে। সৌভাগ্যের বিষয় হলো, এই প্রযুক্তিগুলোর অধিকাংশই ওপেন সোর্স, অর্থাৎ মুক্তভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, ওপেন সোর্স ব্যাপারটি আসলে কী? সহজ করে বলি। আমরা কম্পিউটারে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ (Windows) ব্যবহারের উদাহরণ নিতে পারি — এটি একটি মালিকানাধীন (প্রোপ্রাইটারি) সফটওয়্যার, যেটির সোর্স কোড সাধারণ ব্যবহারকারীরা জানতে বা পরিবর্তন করতে পারেন না। এর বিপরীতে লিনাক্স (Linux) হচ্ছে এমন একটি জনপ্রিয় অপারেটিং সিস্টেম, যার মূল কোড যিনি লিখেছেন তিনি তা মানবজাতির জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। বর্তমানে ইন্টারনেটে ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে অধিকাংশ সার্ভার এই লিনাক্স ব্যবস্থায় চলছে, কারণ এটি কম খরচে সবার জন্য সহজলভ্য।
ঠিক একইভাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অত্যাধুনিক যেসব কোড ও মডেল (যেমন LLM ও ডিপ লার্নিং) আজ উদ্ভাবিত হয়েছে, সেগুলো উন্মুক্ত থাকায় আমরা একধরনের ত্বরিত জ্ঞানপ্রাপ্তি ঘটাতে পারছি। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের শিক্ষার্থী-গবেষকরাও বড় কোনো ল্যাব বা জটিল যন্ত্রপাতি ছাড়াই, কেবল কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই জ্ঞান ও সরঞ্জামগুলো ব্যবহার করতে পারছে। এতে দেশ হিসেবে আমাদের প্রচুর সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে এবং প্রতিযোগিতামূলকভাবে দ্রুত একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
