খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু বদলে দিচ্ছে পৃথিবী! কী এই ন্যানো প্রযুক্তি?
লিংক: https://bangla.bdnews24.com/kidz/5f27baafcc17
তারিখ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
চাঁদপুরের একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যানো বিজ্ঞানের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিন। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে কাটানো শৈশব, তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুল ও ঢাকা কলেজে গড়ে ওঠা শিক্ষাজীবন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে উচ্চশিক্ষা- সব মিলিয়ে তার বৈজ্ঞানিক যাত্রার বীজ বোনা হয়েছিল খুব ছোটবেলাতেই।
নানা আর্থিক সীমাবদ্ধতা, বাবার সংগ্রাম এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ সত্ত্বেও তিনি দমে যাননি। দীর্ঘ প্রস্তুতি, অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ এবং অক্লান্ত অধ্যবসায়ের ফল হিসেবে তিনি ১৯৯৪ সালে জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পান, যা তার গবেষণা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোপিন স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ন্যানোটেকনোলজি’-র পরিচালক। সেখানে তিনি এনার্জি, ন্যানোমেডিসিন, জলশোধন থেকে শুরু করে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ন্যানোপার্টিকেল পর্যন্ত নানা অগ্রগামী গবেষণা পরিচালনা করছেন। তার গবেষণাগারটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উদ্ভাবন এবং তরুণ গবেষকদের প্রশিক্ষণের একটি উন্মুক্ত ক্ষেত্র।
ন্যানো প্রযুক্তি এমন একটি বিজ্ঞান, যা ক্ষুদ্রতম কণাকে ব্যবহার করে বৃহত্তম সমস্যার সমাধান খুঁজে পায়। সোনা থেকে লিপিড ন্যানো পার্টিকেল, মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে ক্যান্সার চিকিৎসা- প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যানো প্রযুক্তির সম্ভাবনা অসীম। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য তার সাফল্য শুধু অনুপ্রেরণা নয়, বরং এক বাস্তব প্রমাণ যে- সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও বিজ্ঞানচর্চার প্রতি ভালোবাসা থাকলে বিশ্বমানের গবেষণাও আমাদের নাগালের মধ্যেই থাকে। তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে উঠে এলো তারই বার্তা।

গবেষণাগারে সহকর্মীদের সঙ্গে বিজ্ঞানী জামাল উদ্দিন (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)।
মশিউর রহমান: ন্যানো প্রযুক্তি আসলে কী? এত ছোট কণাকে বিজ্ঞানীরা কীভাবে ব্যবহার করেন?
জামাল উদ্দিন: ন্যানো টেকনোলজি বলতে আমরা বুঝি এমন সব ক্ষুদ্র কণা নিয়ে কাজ করা, যাদের আকার এক মিটারের একশ কোটি ভাগের এক ভাগ। এই কণাগুলো এতই ক্ষুদ্র যে খালি চোখে দেখা যায় না। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কণার আকার এত কমে এলে এর বৈশিষ্ট্যও পুরোপুরি বদলে যায়। যেমন, বড় আকারের সোনা সব সময় হলুদ, কিন্তু ন্যানো আকারে সোনা লাল, সবুজ বা নীল, সবই হতে পারে।
এই আকার-নির্ভর বৈশিষ্ট্যই ন্যানো প্রযুক্তিকে শক্তিশালী করে তোলে। বিজ্ঞানীরা বিশেষ যন্ত্র, যেমন ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ (টিইএম) বা স্ক্যানিং ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ (এসইএম) দিয়ে এসব কণাকে দেখতে ও বিশ্লেষণ করতে পারেন, যা আমাদের চিকিৎসা, কৃষি ও জলশোধনসহ নানা ক্ষেত্রে নতুন সমাধান দেয়।
মশিউর রহমান: সোনা ন্যানো আকারে গিয়ে রঙ বদলে ফেলে, এটার বৈজ্ঞানিক কারণ কী?
জামাল উদ্দিন: ন্যানো সোনার রঙ কেন বদলে যায়, এটা খুব সহজভাবে বোঝা যায় আলো ও সোনার কণার আকার দিয়ে। বড় সোনার অলংকারে আলো পড়লে তা একইভাবে প্রতিফলিত হয়, তাই আমরা সব সময় একই হলুদ রঙ দেখি। কিন্তু সোনাকে যখন বিজ্ঞানীরা ন্যানো আকারে ভেঙে ফেলেন, তখন কণাগুলো এত ছোট হয়ে যায় যে আলোর আচরণ পুরোই বদলে যায়। আলো ন্যানো কণার ভেতরে প্রবেশ করে এবং ভেতরের ইলেকট্রনগুলো একসঙ্গে স্পন্দিত হতে থাকে। এই কম্পন সামান্য আকার বদলালেই বদলে যায়, আর তার সঙ্গে বদলে যায় কণার রঙ। এটাকেই বলা হয় ‘সারফেস প্লাজমন রেজোন্যান্স’ বা এসপিআর। একই সোনা ১০ ন্যানোমিটারে লাল দেখাতে পারে, ২০ ন্যানোমিটারে নীল, আবার অন্য আকারে সবুক। মনে হবে যেন সোনা নিজেই রঙিন হয়ে গেছে। আসলে রঙ বদলাচ্ছে আলোর সঙ্গে এই ছোট কণাগুলোর নতুন ধরনের সম্পর্কের কারণে।
মশিউর রহমান: কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনে ন্যানো প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করেছে?
জামাল উদ্দিন: কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনে ‘লিপিড ন্যানোপার্টিকেল’ বা এলএনপি নামের ন্যানো কোটিং ব্যবহার করা হয়েছে। এই ন্যানো স্তরটি ভ্যাকসিনের মূল উপাদান মেসেঞ্জার রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিডকে (এমআরএনএ) রক্ষা করে, যাতে এটি শরীরে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট না হয়ে যায়। ন্যানো স্তরটি কোষে এমআরএনএ প্রবেশ করতেও সাহায্য করে। সাধারণভাবে একটি ভ্যাকসিন তৈরি করতে ১০-১৫ বছর লাগে, কিন্তু ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এই সময় কমে এসেছে মাত্র ১-২ বছরে। পৃথিবীর কোটি মানুষের জীবন বাঁচাতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মশিউর রহমান: আপনার গবেষণাগারে কোন কোন ক্ষেত্রে ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে কাজ হচ্ছে?
জামাল উদ্দিন: আমাদের সেন্টারে এনার্জি, ন্যানোমেডিসিন, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ন্যানোপার্টিকেল, জলশোধন, ন্যানো ফিলট্রেশন, ন্যানো-ফার্টিলাইজার ও ন্যানো-পেস্টিসাইড, বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণা চলছে। আমরা সিলভার ও গোল্ড ন্যানোপার্টিকেল দিয়ে জীবাণুনাশক উপাদান তৈরি করি, মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্মূলের ফিল্টার বানাই এবং ক্যান্সার টার্গেটিং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করি। এগুলোর প্রতিটি প্রকল্পই সমাজ ও পরিবেশ উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মশিউর রহমান: মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক এখন বড় সমস্যা। ন্যানো প্রযুক্তি কীভাবে এগুলো দূর করতে পারে?
জামাল উদ্দিন: মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক চোখে দেখা যায় না, কিন্তু পানীয় জল থেকে শুরু করে সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। আমরা ন্যানো ফিলট্রেশনের মাধ্যমে ৯৮-৯৯% প্লাস্টিক কণা অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছি। বিশেষ ধরনের ন্যানো-ম্যাটেরিয়াল পানি থেকে এই কণাগুলোকে টেনে বের করে আনে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি বাংলাদেশের পানিশোধন ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মশিউর রহমান: ন্যানো প্রযুক্তি কি কৃষিক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে?