লিংক: https://bangla.bdnews24.com/kidz/1e1f1ea17f71

তারিখ: ১০ জুন ২০২৫

“আমরা যে মেঘের দৃশ্যটি দেখি, সেই একই রকম আকৃতির মেঘ আর কখনও দেখা যাবে না।”

‘রোমান্টিক আইল্যান্ড প্যারাডাইস’ খ্যাত মালদ্বীপ। ছবি: সংগৃহীত

‘রোমান্টিক আইল্যান্ড প্যারাডাইস’ খ্যাত মালদ্বীপ। ছবি: সংগৃহীত

প্রবাস জীবনের একটি বড় অংশই কাটালাম ‘স্মার্ট সিটি’ নামে পরিচিত সিঙ্গাপুর শহরে। হঠাৎ হাতে কয়েকদিন ছুটি পাওয়ায় এবং বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গিন্নীকে নিয়ে বেড়িয়ে আসলাম ‘রোমান্টিক আইল্যান্ড প্যারাডাইস’ খ্যাত মালদ্বীপ। ধারাবাহিকভাবে তিন খণ্ডের আজ পরিবেশন করছি তার প্রথম খণ্ডটি, মালে দ্বীপ ভ্রমণের গল্প।

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই হোটেলে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের খোঁজ করছি, কিন্তু ট্যাক্সি কোথায়! এটা তো দেখি ফেরিঘাট! হালকা সবুজ ও নীল রঙের মিশ্রণের ফিরোজা রঙের সমুদ্রের পানির মাধুর্যে বিহ্বল হয়ে গেলাম। ডেকে থাকা ফেরির কাপ্তান সাহেবের সহকারী হাঁক দিচ্ছেন, “আর কেউ কি যাবেন ওই পাড়ে?”

তার ফেরিটি মোটামুটি পর্যটকে ভর্তি হয়ে গেছে। তারপরও শেষে হয়তো আরো কিছু যাত্রী পাবেন সেই আশায় হাঁক দিচ্ছেন। তবে তার ডাকে ঢাকার বাসের কনডাক্টরদের মতো জোর নেই। “আর কেউ কি যাবেন, মালেতে!” মালে কোথায় কিছুই জানে না, কিন্তু গিন্নী দেখি ইতোমধ্যে ফেরিতে উঠে বসে আছে। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষকে নিয়ে এই হলো মুশকিল! কী আর করা, দ্বিধাদ্বন্দ্বে তার পেছন পেছন আমিও উঠে বসলাম। হাড়কিপটে আমি জিজ্ঞেস করে নিলাম, কত রে? “মাত্র এক ডলার।” শুনে আমিও উঠে বসলাম। ভাবছেন কোথায় এসেছি? বুঝে নিন তবে।

আমাদের বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গিন্নীকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য চুপিচুপি বিমানের টিকেট ও হোটেল বুক করেছিলাম। আসার আগের দিন যখন গিন্নীকে জানালাম, তার তো খুশি আর ধরে না। ও হ্যাঁ, গিন্নীর সঙ্গে পরিচয় করে দিই, মুশফেকা মিতু। তিনি হলেন আমার এই যাত্রার একমাত্র সঙ্গী। সিঙ্গাপুর থেকে সরাসরি মালদ্বীপের বিমান থাকলেও টিকেটের মূল্য দেখে মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। অনেক গবেষণা করে বের করলাম - যদি শ্রীলঙ্কার বিমানে আমরা শ্রীলঙ্কাতেই ট্রানজিট করে তারপর মালদ্বীপে যাই, তবে খরচ প্রায় অর্ধেকের মতো হবে। এছাড়া ট্রানজিটে যদি একটু বেরও হতে পারি তবে শ্রীলঙ্কাটা ভ্রমণ করা হবে, রথও দেখা হবে আবার কলাও বেচা যাবে।

সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর থেকে সময়মতো আমাদের বিমান আকাশে উড়াল দিলো। একটু পর আকাশের মাঝে মেঘের মধ্য দিয়ে উড়ে যাচ্ছি। দিনের বেলায় যাওয়ার কারণে তুলোর মতো মেঘের দৃশ্য দেখার সুযোগ পেলাম। আমার এক জাপানি বন্ধু একবার বলেছিল, তাদের দেশে প্রবাদ আছে, “যদি কেউ মেঘের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ কোনোকিছু ভাবে, তবে তার মনের কথাগুলো মেঘে ভেসে চলে যাবে।” জানি না এই কথা কতটুকু সত্য, খুব দেশের কথা মনে পড়ে, এবং মনে হয় সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে বাংলাদেশে চলে যাই। মেঘের দিকে তাকিয়ে সেটিই ভাবতে লাগলাম, জানি না আমার সেই ভাবনা জাপানি প্রবাদের মতো মেঘের কাছে চলে গেল কিনা!

![ও হ্যাঁ, গিন্নীর সঙ্গে পরিচয় করে দিই, মুশফেকা মিতু। তিনি হলেন আমার এই যাত্রার একমাত্র সঙ্গী।

](attachment:daea9ed8-1107-4187-abb0-cf00903856b2:image.png)

ও হ্যাঁ, গিন্নীর সঙ্গে পরিচয় করে দিই, মুশফেকা মিতু। তিনি হলেন আমার এই যাত্রার একমাত্র সঙ্গী।

ট্রানজিটে শ্রীলঙ্কায় কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ঘণ্টাখানেক পর দ্বিতীয় বিমানে আমরা রওনা দিলাম মালদ্বীপের উদ্দেশে। বিমানের অপেক্ষারুমে গিয়ে দেখি বেশিরভাগই পশ্চিমা পর্যটকরা রুম ভরে আছে। বেশ বয়সীই মনে হলো। এক বৃদ্ধাকে দেখে মনে হলো, বয়স ১০০ ছুঁইছুঁই। বয়স হলে হবে কি, সুন্দর পরিপাটি করে সেজেছে এবং বেশ শৌখিন বলে মন হলো, পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়াতে এসেছে। আমরা বাংলাদেশিদের বৃদ্ধদের নিয়ে খুব একটা বের হতে দেখি না, তাদের শখকে আমরা গুরুত্ব দিই না। এ মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।

একটু পর আমাদের ডাক পড়লে আমরা বিমানে উঠে বসলাম। বিমান এগিয়ে চললো দক্ষিণ-পশ্চিমে, নিরক্ষরেখার উষ্ণ অঞ্চলের দিকে। আকাশে উঠার পর আবারও দেখলাম সেই সাদা মেঘের ভেলার দৃশ্য। আমরা দুজনই অবাক বিস্ময়ে মেঘের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। কোনো এক বিজ্ঞানী বলেছিলেন, “আমরা যে মেঘের দৃশ্যটি দেখি, সেই একই রকম আকৃতির মেঘ আর কখনও দেখা যাবে না।” হুবহু একই রকম হলেও দেখা যাবে অন্যান্য মেঘের বিন্যাসের সঙ্গে অনেক পার্থক্য। তাই এখন যে মেঘটি দেখছি তা একেবারেই ইউনিক বা অদ্বিতীয়। এরকম মেঘ আর কখনও দেখা যাবে না। সেই দৃশ্যটি শুধু আমাদের জন্যই সৃষ্টিকর্তা তৈরি করেছেন। মেঘ নিয়ে আরেকটি মজার তথ্য দিই। আমরা বিমান থেকে যে সমস্ত মেঘ দেখি, তার গড়পড়তা ওজন প্রায় ৫ লাখ কেজির হয়। এতটা বিশাল ওজনের হলেও পানির কণাগুলো খুব ছোট এবং হালকা হওয়ায় বাতাসে ভেসে থাকতে পারে।

জানালার পাশে বসে মেঘের ভেলার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে দিগন্তে মেঘ আর পৃথিবীর সীমারেখা একাকার হয়ে মিলে গিয়েছিল। মালদ্বীপের কাছাকাছি আসতেই ফিরোজা রঙের জলরাশির মধ্যে সাদা ফেনার মেলা দেখা দিল। প্রথমে ভেবেছিলাম মেঘের ছায়া, কিন্তু তা নয়। ভালোভাবে চোখ মেলে দেখি অসংখ্য ক্ষুদ্র দ্বীপ জেগে উঠেছে সবুজাভ জলরাশির বুকে, যে আকাশ থেকে মুক্তোর মালা ছিঁড়ে ছড়িয়ে পড়েছে নীল সাগরে। সমুদ্রের মাঝে ছোট ছোট দ্বীপগুলোর চারদিকে সবুজ, কখনওবা সাদা রংঙের গোলাকার রিং আর তার মাঝখানে দ্বীপ। খুব অদ্ভুত দৃশ্য দেখে হতবিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম।

আবার কিছু কিছু দ্বীপ সমুদ্রেই ডুবে আছে বলে সেখানে শুধু সবুজ কিংবা হালকা নীল রঙয়ের গোল গোল ছোপ। মনে হলো যেন কেউ রঙতুলিতে ভুল করে সবুজ রঙ ঢেলে দিয়েছে। এমন বিরল দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি। বিমানের ডানায় রোদ ঝিলমিল করে উঠল, আমার হৃদয়ও সেই মুহূর্তে কেঁপে উঠল অপার্থিব সৌন্দর্যে। মনে হলো যেন স্বর্গের কোনো দৃশ্য দেখছি। আমরা দুজনই বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানালাম এমন দৃশ্য দেখানোর সৌভাগ্যের জন্য।

বিমানবালা ঘোষণা করলেন, আমরা মালদ্বীপে অবতরণ করতে যাচ্ছি। জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখি দূরে একটি প্রধান দ্বীপ, রাজধানী মালে। ছোট্ট দ্বীপজুড়ে রঙিন ঘরবাড়িতে ঠাসা এক শহর। মনে হলো, নীল সমুদ্রের মাঝে রঙিন খেলনার শহর বসানো। চারপাশে আরও দ্বীপ ছড়ানো, কোনোটায় একটা লম্বা রানওয়ে চোখে পড়লো। বুঝলাম ওটিই হুলহুলে দ্বীপের বিমানবন্দর, যেখানে নামবো। বিমান ধীরে ধীরে নিচে নামার সময় প্রবাল-প্রাচীর ঘেরা লেগুনের ফিরোজা জল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, আর তার গা ঘেঁষে উড়ে যাচ্ছিল কিছু পাখি। কাছ থেকে বোঝা না গেলেও শঙ্খচিল বা ফ্লাইং ফিশ হতে পারে।

কিছুদূর হেঁটে সামনে পেলাম ‘মসজিদ আল-সুলতান’ নামে একটি বড় মসজিদ।

কিছুদূর হেঁটে সামনে পেলাম ‘মসজিদ আল-সুলতান’ নামে একটি বড় মসজিদ।

একটু পরই আমাদের বিমান অবতরণ করলো মালদ্বীপের ভেলানা বিমানবন্দরে। মালদ্বীপ, নামটার মধ্যেই মিশে আছে অজস্র দ্বীপের মালা। সত্যিই, প্রায় ১ হাজার ২০০টি ছোট ছোট সমতল বালুকাদ্বীপ নিয়ে গঠিত এই প্রবাল রাষ্ট্র, যার মধ্যে মানুষের বসতি রয়েছে প্রায় ২০০টিতে। বাকি অসংখ্য দ্বীপ জুড়ে আছে প্রবালের বেষ্টনী ঘেরা লেগুনের বনভূমি ও ফাঁকা ভূখণ্ড, বা বিলাসবহুল রিজোর্টের নিবাস। আকাশ থেকে মালদ্বীপের এই প্রবাল দ্বীপমালা দেখে মনে হলো, স্বপ্নের রাজ্যে প্রবেশ করছি।

সেই ছোট ছোট দ্বীপের বিন্দুগুলো বড় হতে লাগলো। তবে বিমান ভেলানার রানওয়ে এতটাই সমুদ্রের কাছে যে বিমান অবতরণের সময় মনে হয় পানির উপর নামছে। আমার একবার মনে হচ্ছিল বৈমানিক ভুল করে পানিতে নামাচ্ছে নাতো! কি বিপদের কথা। তবে সেটা অমূলক একটি ভাবনা মাত্র, সঠিকভাবেই তা বিমানবন্দরে পাশেই নামলো।

বিমানবন্দরের সঙ্গেই লাগানো এই ফেরি টার্মিনাল, যার কথা আপনাদের আগেই বলেছি। কোনো কিছু না ভেবে সেই ফেরিতেই উঠে পড়লাম আমরা। বুকভরে বাতাস নিলাম। নোনতা সমুদ্রের গন্ধের সঙ্গে কোথা থেকে ভেসে আসা ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ মিশে আছে। চারপাশে নানা দেশ থেকে আসা পর্যটকের ভিড়, সবাই মোহিত দৃষ্টিতে এই স্বর্গে আগমনের ক্ষণ উপভোগ করছে।