লিংক: https://bangla.bdnews24.com/kidz/9ec680da7692
তারিখ: ২১ আগষ্ট ২০২৫

জাপানে স্নাতক আর মাস্টার্স শেষ করার পর বুঝতে পারলাম, আমি এক চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। সামনে দুটো পথ। একদিকে চাকরি, অন্যদিকে গবেষণার রাস্তা। জানালার পাশে বসে জাপানিজ চা ‘ওচা’ এর কাপে চুমুক দিতে দিতে নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, কোন পথটিতে যাব? কোনটিই বা আমার জীবনের উদ্দেশ্য?
মনে ভেসে উঠল শৈশবের ছবি, ঘরের এক কোণে তার। রেজিস্টর, ট্রানজিস্টরের জটলা, হাতের মুঠোয় নতুন কিছু বানানোর আনন্দ। আর পাশে দাঁড়িয়ে বাবা বলছেন, দেখো, শুধু বানালেই হবে না, বোঝার চেষ্টা করো কেন কাজ করছে। বাবার সে কথাই যেন ভেতরে গেঁথে দিয়েছিল অনুসন্ধিৎসুর বীজ। তাই শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিলাম- গবেষণাই হবে আমার পথ।
আমার মাস্টার্সের শিক্ষক, উচিদা সেনসেই, ছিলেন শান্ত অথচ দৃঢ়স্বভাবের মানুষ। এইখানে বলে রাখি, জাপানে শিক্ষকদের সম্মান করে মূল নামের পরে ‘সেনসেই’ বলা হয় এবং অনেক সময় সংক্ষেপে শুধু ‘সেনসেই’ বলি। এক বিকেলে ল্যাবের দরজায় দাঁড়িয়ে বললাম, সেনসেই, আমি পিএইচডি করতে চাই। কোনো ভালো গবেষণাগারে সুযোগ পেলে…। বাকিটা শেষ করার আগেই তিনি চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, পাশের শহরে একটা বড় গবেষণাগার আছে, চাইলে তোমাকে নিয়ে যাব।
কিছুদিন পর এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে আমার সেই সেনসেই-এর গাড়িতে বেরিয়ে পড়লাম, নতুন সেই শহরে। সেনসেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন আর আমি পাশে বসে ছিলাম। জানালার বাইরে একের পর এক ধানক্ষেত, পাহাড়, আর মাঝে মাঝে ছোট্ট গ্রামে জাপানি বাসাবাড়ি। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল যেন এক জাপানি জলরঙের ছবির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছি। সেনসেই বললেন, এই যে শহরটা, নাম ওকাজাকি। এখানে তোকুগাওয়া ইয়েয়াসুর জন্ম। সেই মুহূর্তে জানতাম না, এই শহর আমার জীবনের চারটি বছরকে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলবে যে, বহু বছর পরও আমি এই শহরটির কথা ভুলতে পারব না।
ওকাজাকি। আইচি প্রিফেকচারের অন্তর্গত, নাগোয়ার কাছেই। চারদিকে পাহাড়ের সবুজ বাঁক, মাঝে শান্ত সমতলভূমি। আর সেই সমতলের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ওকাজাকি দুর্গ, যেন সময়ের গর্ভ থেকে উঠে আসা এক সাদা প্রাসাদ। শহরের ভেতর দিয়ে ধীরেসুস্থে বয়ে চলেছে ওতো নদী। একদিন দুপুরে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম সকালের নরম রোদে পড়ে চমৎকার সোনালি আভা ছড়াচ্ছে। পাশে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধ জেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, এই নদীর নাম কী? তিনি চোখ কুঁচকে হাসলেন, এটা ওতো… কিন্তু পুরনো দিনে আমরা বলতাম তোমোএ-গাওয়া। তারপর আঙুল তুলে দেখালেন দুর্গের দিকে, ওখানেই তো শোগুনের জন্ম।
দুর্গের ইতিহাস যেন স্তরে স্তরে জমে আছে। নদীকে প্রাকৃতিক পরিখা বানানো, সমতলে দুর্গ গড়ে তোলা, সবই জাপানি সমরাস্ত্রের কৌশলের ফল। মেইজি যুগে ধ্বংস হলেও, ১৯৫৯ সালে কংক্রিটে এটিকে পুনর্নির্মাণ করা হয়। ভেতরের জাদুঘরে ঢুকলে দেখা যায় সামুরাইদের তরবারি, বর্ম, আর প্রাচীন কাহিনির মডেল। পঞ্চম তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখ মেলে তাকালে মনে হয়- পুরো ওকাজাকি এলাকাটির সমভূমি যেন এক অদৃশ্য ইতিহাসের মানচিত্র।

আর সেই সমতলের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ওকাজাকি দুর্গ, যেন সময়ের গর্ভ থেকে উঠে আসা এক সাদা প্রাসাদ।
এই শহরের ইনস্টিটিউট ফর মলিকিউলার সায়েন্স-এ পিএইচডি গবেষণার ফাঁকে ফাঁকে আমি চলে যেতাম দুর্গের পাশের পার্কে। এপ্রিলের শেষে যখন সেখানে সাকুরা ফোটে, এই ওকাজাকি শহরটির রঙ বদলে যায়। সবুজ গাছপালা ধীরে ধীরে গোলাপি হয়ে ওঠে। একদিন হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনে বলেছিলাম, শহরটি যেন নববধুর মতন বসন্তের সাজে সেজে নিমন্ত্রণ দিচ্ছে।
ওতো নদীর তীর ধরে দাঁড়িয়ে থাকলে দেখা যায়, প্রায় ৮০০টি চেরি গাছ ফুলে ফুলে ঢেকে গেছে। দিনভর মানুষ আসে, মাটিতে চট বিছিয়ে হানামিতে মেতে ওঠে। জাপানিজ সংস্কৃতির এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এই ‘হানামি’। পরিবার পরিজন, প্রেমিক-প্রেমিকা, কখনওবা সহকর্মী, সবাই মিলে সাকুরা গাছের নিচে একত্রিত হয়ে জাপানিরা সাকুরার ফুলের গন্ধ ও সৌন্দর্য দেখে। এরই নাম ‘হানামি’, বাংলায় ‘ফুলদর্শন পিকনিক’ বলা যেতে পারে। সন্ধ্যা নামলে আলোয় সেজে ওঠে দুর্গ। রঙিন ফানুষের প্রতিফলন নদীর জলে, আর বাতাসে ঝরে পড়া গোলাপি পাপড়ি যেন তুষারের মতো ভাসছে।
এপ্রিলের প্রথম রোববার হয় ‘ইয়েয়াসু গিয়োরেতসু’ নামে শোভাযাত্রা। এক বিকেলে সেই শোভাযাত্রায় দাঁড়িয়ে দেখলাম ঘোড়ার পিঠে তলোয়ারধারী সামুরাই, সুন্দর কিমোনো পরা নারীরা, রাজকুমারীর সাজে শিশুরা। সব মিলিয়ে শহর যেন ৪০০ বছর পেছনে ফিরে গেছে। আমার পাশে দাঁড়ানো এক কিশোর উত্তেজনায় বলল, দেখো, ওটা হোন্দা তাদাকাতসু! আমি হেসে মাথা নাড়লাম, যদিও জানি সেটা একজন অভিনেতা, তবু মুহূর্তের জন্য মনে হলো, ইতিহাসের দরজা যেন খুলে গেছে।
গ্রীষ্মে আসে আতশবাজির উৎসব, ওকাজাকি মাত্সুরি। অগাস্টের প্রথম শনিবার রাতে ওতো আর ইয়াহাগি নদীর সংযোগস্থলে আকাশ ভরে ওঠে আতশবাজির আলোয়। কোন এক বছরের অনুষ্ঠানে আমি নদীর তীরে বসে ছিলাম, হাতে ‘ইয়াকিসোবা’ নামে জাপানি এক ধরনের নুডল। পাশে বসে সেনসেই বললেন, জেনে রেখো, এই আতশবাজির ঐতিহ্য ৪০০ বছরের। তারপর মাইকে ঘোষণা দেওয়ার পর শুরু হল আতশবাজি। আকাশে ফেটে পড়ল সোনালি ও রংবেরঙের আলো, নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল সেই আতশবাজির জ্যোতি। জাপানিরা আতশবাজিকে বলে ‘হানাবি’।
পিএইচডি শেষ করে আমেরিকায় চলে গেলেও ওকাজাকি যেন আমার ভেতরে রয়ে গেল। ২০১০ সালে আবার ফিরলাম। এবার একা নয়, স্ত্রী মুশফেকা মিতু আর দুই ছেলে মেহরাব, মাশরাফিকে নিয়ে। ছেলেদের ভর্তি করালাম দুর্গের পাশে বয়ে যাওয়া সেই ওতো নদীর পাশের একটি স্কুলে। একদিন স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে সাইকেলের চেন ঘুরতে ঘুরতে মনে পড়ল, এখানেই তো কাটত গবেষণার ফাঁকের বিশ্রামের বিকেল, সাকুরার নীরব উৎসব।
পরের বছর ওকাজাকি ছেড়ে চলে আসি সিঙ্গাপুরে। আজও মনে হয়, ওকাজাকি শুধু একটা শহর নয়, এ যেন এক জীবন্ত চলচ্চিত্র। দুর্গের দেয়ালে, নদীর জলে, সাকুরার পাপড়িতে, আতশবাজির রঙে, সবখানে ইতিহাস আর বর্তমানের হাত ধরে চলা। যে একবার এ শহরে আসবে, সে আমার মতোই এর গল্প বুকে নিয়ে ফিরে যাবে।
