লিংক: https://bangla.bdnews24.com/kidz/e13697be123e

তারিখ: ৩০ আগষ্ট ২০২৫

সিঙ্গাপুরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে দূরে, এক ঝলক বিশুদ্ধ অক্সিজেনের খোঁজে আমি আর আমার পরিবার পাড়ি জমিয়েছিলাম অস্ট্রেলিয়ার বুকে। শহুরে কংক্রিটের জঙ্গল আর মানুষের তৈরি কৃত্রিম হাসির ভিড়ে যখন মন হাঁপিয়ে উঠছিল, তখন প্রকৃতির নিস্তব্ধতা আর অকৃত্রিম সৌন্দর্যই হয়ে ওঠে একমাত্র আশ্রয়।

এই যাত্রার মূল আকর্ষণ ছিল নিউ সাউথ ওয়েলসের রহস্যময় জেনোলান কেভস- এক প্রাচীন গুহা, যা পৃথিবীর গর্ভে লুকিয়ে রেখেছে কোটি কোটি বছরের ইতিহাস। সিডনি পৌঁছেই গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম হাইওয়ে ধরে। চারপাশে সবুজের মায়া, পাহাড়ের হাতছানি আর নির্ভার চারণভূমিতে বিচরণকারী পশুপাল দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক স্বপ্নিল ক্যানভাসের মাঝে এসে পড়েছি।

নাগরিক জীবনের দৌড়ঝাঁপ আর প্রতিযোগিতার ইঁদুর-দৌড় থেকে মুক্তি পেয়ে আমার মনে হলো, এই প্রকৃতির বুকেই আসল শান্তি লুকিয়ে আছে। আমার ছেলেরা জানালা দিয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছিল বাইরের পৃথিবী, যেন এক নতুন আবিষ্কারের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি যখন জেনোলান কেভসের দিকে এগোচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল যেন এক অভিযাত্রীর বেশে রওনা দিয়েছি অজানা কোনো গন্তব্যে।

যত দূর চোখ যায় তত সবুজ, আর সেই সবুজের ওপর আকাশের নীলাভ মায়া। মনে হলো আকাশ আর মাটি যেন একে অপরকে আলিঙ্গন করেছে। ছেলে বলল, বাবা, গরুগুলো কি চাকরিজীবী? আমি উত্তর দিলাম, না রে, ওরা প্রকৃতির কর্মচারী। অফিস টাইমে ঘাস খায়, বাকি সময়ে শুয়ে থাকে। এখানকার রাস্তা এতটাই খাড়া এবং দুর্গম যে, প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, সামান্য ভুল হলেই বিপদ। কিন্তু প্রকৃতির মহিমা দেখার যে নেশা, তা সব ভয়কে ছাপিয়ে গিয়েছিল।

জেনোলান কেভসের প্রবেশপথে পৌঁছে টিকেট কেটে অপেক্ষা করতে লাগলাম আমাদের গ্রুপের ডাক পড়ার জন্য। চারপাশে সবুজে ঘেরা পরিবেশে নানা প্রজাতির পতঙ্গ আর সরীসৃপ নিজেদের মতো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছিল, আমরা কেবল অতিথি, আর প্রকৃতি এখানে তার নিজস্ব নিয়মে এক শান্ত সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। অবশেষে আমাদের ডাক পড়ল। গাইডের নেতৃত্বে গুহার অন্ধকার জগতে প্রবেশ করলাম।

বাইরের ঝলমলে আলো মিলিয়ে যেতেই এক গহিন নিস্তব্ধতা আমাদের ঘিরে ধরল। কিছুক্ষণ পর গুহার ভেতরে আলো জ্বলে উঠল, পথ দেখিয়ে দিল এক রহস্যময় সিঁড়ি এবং একটি লিফট। সেই লিফট আমাদের গুহার গভীরে, প্রায় ৩৪ মিটার নিচে নামিয়ে দিল, যা যেন পৃথিবীর হৃৎপিণ্ডের দিকে যাত্রা।

যত দূর চোখ যায় তত সবুজ, আর সেই সবুজের ওপর আকাশের নীলাভ মায়া।

যত দূর চোখ যায় তত সবুজ, আর সেই সবুজের ওপর আকাশের নীলাভ মায়া।

সেখানে পৌঁছে গাইড যখন আলো নিভিয়ে দিলেন, তখন এমন ঘোর অন্ধকার নেমে এল যা আমি জীবনেও দেখিনি। একবিন্দু আলো নেই, কেবল এক জমাট নিস্তব্ধতা। মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছি। সেই কয়েক মুহূর্তের অন্ধকার যেন বুঝিয়ে দিল, মানুষ আলো ছাড়া কতটা অসহায়। আমাদের সব বিজ্ঞান, সব দম্ভ এই অন্ধকারের কাছে ম্লান।

আলো ফিরে আসার পর আমরা হাঁটা শুরু করলাম। গুহার ছাদ থেকে ঝুলে থাকা তীক্ষ্ণ স্ট্যালাকটাইট এবং মাটি থেকে উপরের দিকে উঠে আসা স্ট্যালাগমাইট দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। গাইড জানালেন, ক্ষুদ্র জলের ফোঁটা আর খনিজ পদার্থের হাজার হাজার বছরের অবিরাম সঞ্চয়ে এই অদ্ভুত ভাস্কর্যগুলো তৈরি হয়েছে। প্রকৃতির এই ধৈর্য আর শিল্পের কাছে মানুষ যেন নিতান্তই নগণ্য। এক ফোঁটা জলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এমন মহৎ সৃষ্টির ক্ষমতা দেখে আমি সত্যিই অভিভূত হয়েছিলাম।

জেনোলান কেভস পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন গুহাগুলোর মধ্যে একটি, যার বয়স প্রায় ৩৪ কোটি বছর। বিজ্ঞানীরা এর অসাধারণ ভূতাত্ত্বিক গঠন নিয়ে গবেষণা করছেন। স্থানীয় আদিবাসীরা এই গুহাকে ‘বিনি জেনোলান’ অর্থাৎ ‘শ্বেতশিলা’ নামে ডাকে। ১৮৩৮ সালে জেমস হুইটলি নামে এক ব্যক্তি ভেড়া খুঁজতে গিয়ে দুর্ঘটনাক্রমে এটি আবিষ্কার করেন। ১৮৬৬ সাল থেকে এটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

গুহার ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হলো, আমরা যেন প্রকৃতির এক বিশাল জাদুঘরে প্রবেশ করেছি।

গুহার ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হলো, আমরা যেন প্রকৃতির এক বিশাল জাদুঘরে প্রবেশ করেছি।

আদি অস্ট্রেলীয়রা বহু সহস্রাব্দ ধরে এই গুহা সম্পর্কে জানত এবং এর আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে সম্মান করত। তাদের লোককাহিনী ও বিশ্বাসে এই গুহা ‘পবিত্র স্থান’ হিসেবে বিবেচিত হত, যা তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত ছিল। এই গুহার ৪০ কিলোমিটারেরও বেশি সুড়ঙ্গপথ আবিষ্কৃত হয়েছে, যা এখনও অনেক অজানা রহস্য লুকিয়ে রেখেছে। এখানে বিরল প্রজাতির বাদুড়ের আবাসস্থল রয়েছে, যা গুহার ইকোসিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় গুহার ভেতরে কনসার্টও অনুষ্ঠিত হতো, কারণ এখানকার প্রাকৃতিক প্রতিধ্বনি যেকোনো সঙ্গীতকে এক নতুন মাত্রা দিত।

গুহার ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হলো, আমরা যেন প্রকৃতির এক বিশাল জাদুঘরে প্রবেশ করেছি। প্রতিটি কোণায়, প্রতিটি পাথরের ভাঁজে লুকিয়ে আছে অগণিত গল্প আর অদেখা ইতিহাস। আমার স্ত্রী ও ছেলেরা বিস্ময়ভরা চোখে দেখছিল এই অসাধারণ দৃশ্যপট।

অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ানোর পর যখন আবার বাইরের পৃথিবীতে ফিরে এলাম, তখন মনে হলো যেন এক দীর্ঘ স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছি। আলোতে ফিরে আসার পর জীবনের অন্ধকার ও আলোর সংমিশ্রণটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল। প্রকৃতির কাছে গেলে মানুষ শুধু দর্শক থাকে না, সে যেন একজন ছাত্র হয়ে যায়। প্রকৃতি তার বিশালতা, ধৈর্য এবং অসীম সৌন্দর্যের মাধ্যমে আমাদের অনেক কিছু শেখায়।

অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ানোর পর যখন আবার বাইরের পৃথিবীতে ফিরে এলাম, তখন মনে হলো যেন এক দীর্ঘ স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছি।

অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ানোর পর যখন আবার বাইরের পৃথিবীতে ফিরে এলাম, তখন মনে হলো যেন এক দীর্ঘ স্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছি।

জেনোলান গুহা আমাকে শিখিয়েছে, প্রকৃতি ধৈর্যের প্রতিমূর্তি। কোটি কোটি বছর ধরে সে নিজের সৌন্দর্য গড়েছে। অথচ আমরা মানুষ সবকিছুতেই কেন যেন হুড়োহুড়ি করি। তাড়াতাড়ি ধনী হতে চায়, তাড়াতাড়ি বিখ্যাত হতে চায়, এমনকি ভালোবাসাতেও তাড়াহুড়ো। অথচ প্রকৃতি জানে, আসল সৌন্দর্য জন্মায় ধৈর্যের গর্ভে।