লিংক: https://bangla.bdnews24.com/probash/e187cce00f90

তারিখ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫

সিঙ্গাপুরের অভিবাসী শ্রমিকদের ভোর শুরু হয় রোদ ওঠার আগেই। শহরের কংক্রিট আর ইস্পাতের মাঝে হাজারো প্রবাসীর ঘামের স্রোত বইতে শুরু করে। কেউ নির্মাণস্থলে হাত লাগায়, কেউ সমুদ্রবন্দরে, কেউ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায়। প্রতিটি পদক্ষেপে দেশের অর্থনীতির স্পন্দন মিশে থাকে।

এই শ্রমসমুদ্রে এক বাংলাদেশি তরুণ ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন নিজের আলাদা পথ। কাজের স্বীকৃত হিসেবে দুইবার পেয়েছেন দেশটির ‘প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড’। তার নাম নাজমুল খান (৪৪)।

প্রথমে কেউ তাকে চিনতো না। সহপাঠীদের মতো জীবন ও জীবিকার তাগিদে ২০ বছর আগে তিনিও এসেছিলেন সিঙ্গাপুরে, একজন প্রযুক্তিবিদ হিসেবে। সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘সিটি-সি গ্লোবালে’।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার একটাই প্রশ্ন, এখানকার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য কিছু করা যায় কি? সেই অনুসন্ধান থেকেই জন্ম নেয় ‘টোয়েন্টিফোরএশিয়া’। অলাভজনক এ উদ্যোগই আজ সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে অসংখ্য জীবনের পথ আলোকিত করছে। পরিচালিত হচ্ছে ‘টেমাসেক ফাউন্ডেশন’-এর আওতায় এবং সিঙ্গাপুরের শ্রম মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায়।

শুরুটা হয় ৯ অগাস্ট ২০১৮ সালে, সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবসে। তিনটি মূল লক্ষ্য নিয়ে ‘টোয়েন্টিফোরএশিয়া’ চালু করেন নাজমুল।

এগুলো হল- ১. প্রবাসীদের জন্য বিনামূল্যে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়ন, যাতে তারা ভালো চাকরি এবং কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য খুঁজে পান। ২. প্রবাসী কমিউনিটিকে স্থানীয় সিঙ্গাপুরিয়ান সংগঠন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত করা এবং ৩. একটি পরিবারসদৃশ মঞ্চ তৈরি করা যেখানে তারা উৎসব, আনন্দ ও সংকটের সময় একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারেন।

![টোয়েন্টিফোরএশিয়া’-এর সদস্যদের সঙ্গে নাজমুল খান (বাঁয়ে)।

](attachment:3bc6f555-7b62-4406-99da-90b00b27fb81:image.png)

টোয়েন্টিফোরএশিয়া’-এর সদস্যদের সঙ্গে নাজমুল খান (বাঁয়ে)।

ছুটির দিনগুলোতে যেখানে অনেকে বিশ্রাম নিত, নাজমুল তখন পরিকল্পনা করতেন কীভাবে কয়েকজনকে একসঙ্গে বসিয়ে কম্পিউটার শেখানো যায়, কীভাবে চাকরির আবেদনে আধুনিক জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করতে সাহায্য করা যায়। তিনি মনে করতেন, ছোট ছোট দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়েই বড় পরিবর্তন আসে।

এমনই একদিন এক বাংলাদেশি শ্রমিক এলেন নাজমুলের কাছে। ইংরেজিতে দুর্বল, আত্মবিশ্বাসও কম। নাজমুল শুধু শেখালেন না, পাশে দাঁড়ালেন। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ধৈর্যের সঙ্গে বুঝিয়ে দিলেন। কয়েক মাসের মধ্যেই সেই যুবক হয়ে গেলেন স্থানীয় এক নামকরা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

ইন্টারভিউ বোর্ডে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “কোথায় শিখেছেন?” গর্বের সঙ্গে তিনি উত্তর দিলেন, “টোয়েন্টিফোরএশিয়া থেকে।” সেই মুহূর্তে নাজমুল বুঝলেন, তার উদ্যোগ আর ব্যক্তিগত স্বপ্ন নয়, পুরো কমিউনিটির আশ্রয় হয়ে উঠছে।

নাজমুল খান বলেন, “ আমার কাছে সমাজসেবা কোনো শখ নয়, বরং দায়িত্ব। বিদেশে প্রতিটি বাংলাদেশি আসলে দেশের পতাকা বহন করছে। তাদের হাসি, আচরণ ও আন্তরিকতা, সবই দেশের পরিচয়। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমি কখনো ব্যক্তিগত ফান্ড সংগ্রহে জোর দেইনি; বরং চেয়েছি সংগঠিত কাঠামো আর প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। কারণ টেকসই উদ্যোগ দাঁড় করাতে হলে ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগত চর্চা দরকার।”

এই স্থিরচেতনতা ও কমিউনিটির প্রতি দায়বদ্ধতার ফলেই নাজমুল অর্জন করেছেন সিঙ্গাপুরের সরকারের পক্ষ থেকে দুইবার ‘প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড’। প্রথমে ২০২২ সালে তিনি ‘গুড হিউম্যান’ বিভাগে পুরস্কার পেয়েছিলেন। আর এবার পহেলা অক্টোবর পেলেন ‘কমিউনিটি অব গুড’ বিভাগে সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রপতি থারমান শানমুগারত্মমের কাছ থেকে স্বেচ্ছাসেবক ও দাতব্য পুরস্কার।

কিন্তু নাজমুলের চোখে এগুলো ব্যক্তিগত সম্মান নয়। তিনি বলেন, “এগুলো আমার দলের, আর বাংলাদেশের।” পুরস্কারের ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশ পায়, কিন্তু প্রকৃত গল্প লুকিয়ে থাকে অন্য কোথাও। কারও রক্তদানে জীবন বাঁচে, কারও নতুন চাকরিতে পরিবারের মুখে হাসি ফোটে, কারও প্রথম পাবলিক স্পিকিং ক্লাসে কাঁপা গলায় আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয়।

‘টোয়েন্টিফোরএশিয়া’ প্রতি মাসে সিঙ্গাপুরের তিনটি স্থানে শ্রমিকদের জন্য বিনামূল্যের দক্ষতা উন্নয়ন ক্লাসের আয়োজন করে। মাইক্রোসফট অফিস, পাবলিক স্পিকিং আর জীবনবৃত্তান্ত তৈরির প্রশিক্ষণ- এসব কার্যক্রম প্রবাসীদের নতুন দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করছে। নাজমুলের প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৮০০ জন প্রবাসী প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, আটশরও বেশি ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ হয়েছে এবং ৭ হাজার ৫০০ কেজির বেশি ময়লা ও আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়েছে।

প্রবাসীরা জানান, “এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমিকরা নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করছেন এবং তা কাজে লাগিয়ে সফল হচ্ছেন। সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল দেশগুলোর একটি, যেখানে শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের জন্য প্রচুর অর্থ প্রয়োজন। সেখানে টোয়েন্টিফোরএশিয়ার এই কার্যক্রম শ্রমজীবীদের জন্য উপকারী হয়ে উঠেছে।”

নাজমুল জানান, তিনি তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫০ জন ‘অ্যাম্বাসাডর’ তৈরি করেছেন, যারা আরও নতুন ‘চেঞ্জমেকার’ তৈরি করছেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনজন ‘অ্যাম্বাসাডর’ এবছর পেয়েছেন ‘সিঙ্গাপুর সাইলেন্ট হিরো অ্যাওয়ার্ড’।

নাজমুল নিজে শুধু উদ্যোক্তা নন, আরও অসংখ্য উদ্যোক্তা তৈরি করছেন; যারা নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন আর নতুন আত্মবিশ্বাসের আলো অন্যদের দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।