নারা জাপানের প্রথম স্থায়ী রাজধানী। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ৭১০ খ্রিস্টাব্দে। এসময়ে জাপানি ইতিহাসকে বলা হয় ‘নারা যুগ’।

লিংক: https://bangla.bdnews24.com/kidz/f3c303f6572a

তারিখ: ২২ জুলাই ২০২৫

তোদাই-জি মন্দিরের একটি পেন্সিল স্কেচ।

তোদাই-জি মন্দিরের একটি পেন্সিল স্কেচ।

যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি এই দেশ থেকে অন্য দেশে। তবে বঙ্গদেশ ছাড়া অন্য কোন দেশের সাথে যদি নাড়ির টান থাকে, তবে সম্ভবত তা জাপানই হবে। কেননা এই দেশেই আমার সম্পূর্ণ উচ্চশিক্ষার সময়টি কাটিয়েছি। ডক্টরেট ডিগ্রির পর জাপান ছেড়েছি বহু বছর হলো, কিন্তু কর্মজীবনে আবারও কিছুটা সময় আমাকে জাপানে কাটাতে হলো।

দ্বিতীয় এই ভ্রমণে জাপানকে আবারও আবিষ্কার করলাম অন্য চোখে। চেনা জিনিসকে দেখলাম নতুন চোখে। সেই ভ্রমণ গল্পে আপনাদেরকে নিয়ে যাচ্ছি জাপানের প্রথম রাজধানী নারা শহরে। দুটি পর্বের এই গল্পে আজকে থাকছে শেষ পর্বটি।

প্রথম পর্বে বলেছিলাম, নারা শহরের হরিণদের গল্প। সেই হরিণদের সাথে সময় কাটিয়ে এবার নারার আরেকটি তীর্থস্থানের দিকে পা বাড়ালাম। বিশাল তোদাই-জি মন্দিরের দিকে এগোতেই প্রথমে পড়ল তার সুবিশাল দক্ষিণদ্বার নন্দাইমোন। এই প্রবেশদ্বারের দুই পাশে কাঠের নির্মিত দুই বিরাট দ্বাররক্ষী (নিও) দেবতার মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলো যেন শতাব্দী প্রাচীন মর্যাদায় আগত সবাইকে অভিবাদন জানাচ্ছে।

প্রাচীন কাঠের তোরণের ফাঁক দিয়ে ভেতরে পা রেখেই নজরে এলো দাইবুতসুদেন, তোদাইজি মন্দিরের প্রধান হলঘর, যার আকার ও বিস্তার অনেক দূর থেকে একটি পাহাড়ের মতো মনে হচ্ছিল। যত সামনে এগোলাম, তার বিশালত্ব তত স্পষ্ট হতে লাগল। অনুভব করলাম মানুষের তুলনায় স্থাপনাটির আকার অনেক বড়।

প্রধান হলটির উচ্চতা প্রায় ৪৮ মিটার। এটিই বিশ্বের সর্ববৃহৎ কাঠের নির্মিত স্থাপনা বলে পরিগণিত হয়। বিশাল কাঠের দরজা পেরিয়ে হলের ভেতর প্রবেশ করতেই আলো-আঁধারিতে অবস্থিত এক অন্যরকম অনুভূতি হলো। সামনে বিরাজ করছে বিশালাকার ব্রোঞ্জ নির্মিত বুদ্ধের মূর্তি, যাকে জাপানিরা বলে ‘দাইবুতসু’। এই বৌদ্ধমূর্তিটি জাপানের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধমূর্তি এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্রোঞ্জ নির্মিত প্রতিমা।

মন্দিরের উঁচু ছাদ পর্যন্ত পৌঁছানো প্রায় ৫০ ফুট উচ্চতার এই মহাবৌদ্ধের প্রশান্ত মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সেই সময়ের মানুষ কীভাবে এই বিশাল প্রতিমাটি তৈরি করলো? তবে উল্লেখ করতে হবে যে এই ভবনটি ৭৫২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল এবং তখন এটি আরও বড় ছিল। পরবর্তীতে অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের কারণে ভবনটি পুনঃনির্মাণ করা হয় এবং তখন তার আকার ছোট করে রাখা হয়।

আরেকটি ব্যাপার হলো, এই মন্দিরটি নির্মাণ কাজ এতটাই ব্যয়বহুল ছিল যে, সমসাময়িক জাপানের রাজকোষ প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ২০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই নির্মাণ কাজে অংশ নিয়েছিলেন। কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ শ্রম দিয়ে, আবার কেউবা উপকরণ দিয়ে। ৭৫২ খ্রিস্টাব্দে এই প্রতিমাটি তৈরির পরে তা জনসম্মুখে উন্মোচন করা হয়, তার চোখ খোলার মাধ্যমে একটি জাপানিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যা ‘কাইগেন’ নামে পরিচিত।

এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন একজন ভারতীয় সন্ন্যাসী, যার নাম ছিল বোধিসেনা। তিনি ভারত থেকে দীর্ঘ যাত্রা করে জাপানে আসেন এবং এই মূর্তির প্রতিষ্ঠা ও বৌদ্ধধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মনে হল, এই বৌদ্ধ প্রতিমাটির অর্ধনিমীলিত দৃষ্টি যুগের পর যুগ অসংখ্য ভক্তের শ্রদ্ধা প্রত্যক্ষ করে এসেছে। চারদিকে ধূপের সুগন্ধ ও ধোঁয়ার কুণ্ডলি ঘুরছে, কোথাও দূরে একটানা ঘণ্টাধ্বনির প্রতিধ্বনি প্রাচীন স্তম্ভের হলঘরে গমগম করতে করতে যেন সময়কে ধীর করে দিচ্ছে।

সামনে বিরাজ করছে বিশালাকার ব্রোঞ্জ নির্মিত বুদ্ধের মূর্তি, যাকে জাপানিরা বলে ‘দাইবুতসু’।

সামনে বিরাজ করছে বিশালাকার ব্রোঞ্জ নির্মিত বুদ্ধের মূর্তি, যাকে জাপানিরা বলে ‘দাইবুতসু’।

অন্যান্য দর্শনার্থীরা নীরবে এই বিশাল মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ প্রার্থনায় মগ্ন, কেউ মূর্তির ঐতিহাসিক মহিমা পড়ে শোনাচ্ছেন তাদের সঙ্গীদের। আমার চারপাশে সেই নিস্তব্ধ বিস্ময়ের আবহ আমাকে আরো নিবিষ্ট করে তুলল। বিশ বছর আগে যখন প্রথম তোদাই-জি দর্শন করতে এসেছিলাম, মহাবৌদ্ধের এই বিশালত্ব আমাকে হতবাক করেছিল। আজ দীর্ঘদিন পর আবার একইরকম মুগ্ধতা নিয়ে আমি তার সম্মুখীন হলাম। জীবনে বহু পরিবর্তন ঘটে গেছে, কিন্তু এই অটল ব্রোঞ্জমূর্তির শান্ত অভিব্যক্তি বিন্দুমাত্র বদলায়নি। সে তার অমোঘ উপস্থিতিতে মানবজাতির বহু প্রজন্মের পদচিহ্নের সাক্ষী হয়ে বিরাজমান।

মন্দির ঘোরার পরে হাঁটতে হাঁটতে শরীরে ক্লান্তি অনুভব হচ্ছিল। দুপুর গড়িয়ে আসায়, পার্কের কাছের একটি সরু গলির মোড়ে ছোট্ট এক জাপানি নুডলসের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, জাপানিজ ভাষায় একে ‘সোবা’ বলে। দোকানের ঝুল বারান্দায় পুরনো কাঠের সাইনবোর্ডে লেখা নামটা চোখে পড়তেই স্মৃতির পাতায় একটা ঝিলিক খেলল। কুড়ি বছর আগে প্রথম আগমনে এই দোকানেই একবার খেয়েছিলাম!

ভেতরে ঢুকে দেখি সেটিই যেন আছে আগের মতো। লালচে পুরনো কাঠের টেবিল-বেঞ্চ, দেয়ালে স্থানীয় উৎসবের বিবর্ণ পোস্টার, কোণায় এক বিশীর্ণ টেলিভিশন মিউট করে চলেছে। রান্নাঘরের পার্টিশনের আড়াল থেকে বছর ষাটেকের এক জাপানি নারী, হয়তোবা দোকানটির মালিক, উঁকি দিয়ে সাদরে হাসলেন। আমাকে চিনতে পারেননি নিশ্চয়, কিন্তু তার আন্তরিক অভ্যর্থনায় নিজেকে তখনই আপন কেউ বলে মনে হলো।

ছোট ঘরটির উষ্ণ পরিবেশ, দেয়ালে ঝোলানো পাতা-খসখসে ক্যালেন্ডার আর ধোঁয়াটে আলো দেখে মনে হলো যেন পুরনো জাপানে সময় কাটাচ্ছি। একটু পরে জাপানিজ সবুজ চা বা গ্রিন-টি আমার সামনে নিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে জানতে চাইলেন, আমি কী খাব। বুঝলাম এই দোকানে পর্যটকদের আনাগোনার কারণে তিনি ইংরেজি ভাষাটা একটু আধটু রপ্ত করে নিয়েছেন। আমি উত্তরে জাপানিজ খাবারের অর্ডার দিলে। উনি অবাক হয়ে বললেন, তুমি তো বেশ ভালো জাপানিজ বলো হে!

আমি সুযোগ বুঝে নারার স্থানীয় স্বরে আরো কিছুক্ষণ কথা বললে, উনি বললেন, তুমি তো দেখি নারার আঞ্চলিক ভাষাও জানো দেখছি! এইখানে বলে নিই, নারার আঞ্চলিক জাপানি ভাষাকে এরা বলে ‘নারা বেন’। বাংলাদেশে আমরা যেভাবে রাজশাহি, নোয়াখালীর লোকজন আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলি, তেমনি শুদ্ধ জাপানি ভাষার পাশাপাশি আঞ্চলিক কিছু ভাষা আছে, যার উচ্চারণ খুব মৌলিক। দীর্ঘদিন এই শহরে থাকার কারণে আমি নারার আঞ্চলিক ভাষা বা নারা-বেন রপ্ত করে নিয়েছিলাম।

তার অবশ্য কৃতিত্ব আমার বন্ধু ইয়ামাগুচি। এই ছেলেটি নারাতে আমার হোস্টেলে পাশের রুমে থাকতো। দীর্ঘদিন ধরে তার সাথে কথোপকথন করার কারণে আমি এই নারার স্থানীয় উচ্চারণেই কথা বলতে শিখেছিলাম।

অর্ডার দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই ধোঁয়া ওঠা এক বাটি গরম ‘সোবা’ পৌঁছে দিলেন জাপানি নারী। সুপের হালকা ঝাঁঝালো সুঘ্রাণ আর তাজা পেঁয়াজকুচি ও সামুদ্রিক শৈবালের সুবাস নাকে এলো। হাতজোড় করা ধন্যবাদ জানিয়ে এক চুমুক নিয়ে দেখলাম, সোনালি ঝোলটা গলা বেয়ে নামতেই সমস্ত ক্লান্তি যেন মুছে গেলো। মিহি আর লম্বা এই সোবা নুডলগুলো জাপানি সংস্কৃতিতে ‘দীর্ঘায়ুর প্রতীক’ হিসেবে গণ্য হয়, আর আজ এর প্রতিটি গ্রাসে আমি যেন আমার দীর্ঘদিনের ফেলে আসা স্মৃতিগুলোকেও নতুন করে আস্বাদন করছি।