শত শত বছর ধরে গাছটি বহন করে চলেছে এক বেদনাময় প্রেমের কাহিনি।
লিংক: https://bangla.bdnews24.com/kidz/3ac87f4faf11
তারিখ: ৫ আগষ্ট ২০২৫

‘কান্নার গাছ’, যার ভেতর মজুদ কার্বন-১৪ পরিমাপ করে গাছটির বয়স প্রায় ৭৫২ বছর ধরা হয়েছে।
তুরস্কের বুরশা প্রদেশের নিস্তব্ধ গ্রাম গোলিয়াজি। হ্রদের জলরাশি এখানে যেন সময়কে বেঁধে রেখেছে। আর ঠিক সেই হ্রদের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল গাছ। স্থানীয়রা যাকে বলে ‘আগলায়ান চিনার’, বাংলায় যার অর্থ ‘কান্নার গাছ’। এই গাছ শুধু একটি প্রাকৃতিক নিদর্শন নয়। শত শত বছর ধরে এটি বহন করে চলেছে এক বেদনাময় প্রেমের কাহিনি, যা স্থানীয়দের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে, আর পর্যটকদের হৃদয়ে রেখে যায় এক দীর্ঘশ্বাস।
অনেক অনেক বছর আগের কথা। তখন গোলিয়াজি ছিল অ্যাপোলিওন্ত নামে পরিচিত একটি ছোট শহর, যেখানে তুর্কি মুসলমান ও গ্রিক খ্রিস্টানরা মিলেমিশে বসবাস করত। শান্ত হ্রদে ঘেরা এই শহরে বসবাস করত তুর্কি যুবক মেহমেদ, এক তুর্কি জেলের ছেলে। আর সেই একই শহরে ছিল এক সুন্দরী গ্রিক মেয়ে, এলেনি। ছোটবেলা থেকেই তারা একসাথে লেকের ধারে খেলত, মাছ ধরত, গল্প করত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বন্ধুত্ব পরিণত হয় গভীর ভালোবাসায়। কিন্তু সমাজের চোখে তারা ভিন্ন জাত, ভিন্ন ধর্মের, এই প্রেম মেনে নেয়নি কেউই। এলেনির পরিবার রক্ষণশীল ছিল, বিশেষ করে তার বড় ভাই। সে মেহমেদকে পছন্দ করতো না এবং হুমকি দিত যাতে সে এলেনির কাছ থেকে দূরে থাকে। তবুও, ভালোবাসা সহজে থেমে থাকে না। মেহমেদ ও এলেনি গোপনে দেখা করত হ্রদের ধারের এক বিশাল গাছের নিচে। সেখানেই তারা শপথ করেছিল, একদিন সব বাধা পেরিয়ে তারা একসাথে থাকবে।
কিন্তু সেই স্বপ্ন কখনো পূরণ হলো না। এক রাতে, যখন মেহমেদ গোপনে দেখা করতে এসেছিল, তখন এলেনির বড় ভাই এবং তার কিছু লোক গাছের নিচে হানা দেয়। সেখানে ঘটে এক ভয়াবহ ঘটনা, তাদের হাতে মেহমেদ খুন হয়। খবরটি যখন এলেনির কানে পৌঁছে, সে দৌড়ে আসে সেই ছায়াগাছের নিচে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। সে পৌঁছে দেখে তার ভালোবাসার মানুষটি নিথর পড়ে আছে।

হ্রদটির নাম ‘উলবাত’। হ্রদের পাশে কয়েকটি নৌকা বেঁধে রাখা রয়েছে। ছবি: লেখক
শোক, ক্ষোভ আর নিঃসঙ্গতার ভারে এলেনি সেদিন সেই গাছের গায়েই নিজেকে ঝুলিয়ে দেয়। গ্রামবাসীরা সকালে এসে দেখে, দুজনের দেহ পাশাপাশি পড়ে আছে। আর সেই গাছের কাণ্ড থেকে এক ধরনের লালচে তরল বের হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন গাছটি কান্না করছে। সেদিন থেকে গাছের ভাঙা গহ্বর থেকে রক্তঝলসানো পানির ফোঁটা পড়তে থাকে, যেন প্রেমের রক্তাক্ত স্মৃতিকে ধরে রাখতে চায়। এই গল্পের মর্মস্পর্শী সংবাদ তুর্কি দৈনিক সাবাহ পত্রিকায়ও বর্ণিত হয়েছে।
কথিত আছে, ওই ঘটনা থেকেই স্থানীয়রা এই গাছটিকে ‘কান্নার ছায়াগাছ’ নামে ডাকে। বলা হয়, “স্থানীয় লোককথায় এই গাছটির নাম কান্নার গাছ নামে পরিচিত; গ্রিক এলেনি ও তুর্কি মেহমেদ উভয়ই তাদের অবাস্তব ভালোবাসার টানে আত্মহত্যা করে এবং গাছটির নিচে প্রাণ হারায়।” এই কিংবদন্তি প্রেমগাথা শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির যন্ত্রণা তুলে ধরে। এই পুরনো বটগাছটি আজও সেই ইতিহাসের শোকময় রক্তাক্ত স্মৃতি বহন করছে বলে ধরা হয়।
বুরশা থেকে কীভাবে আমি এই গোলিয়াজিতে পৌঁছলাম, তার গল্পটাই বলি আপনাদের। আমার অর্ধাঙ্গিনী মুশফেকা মিতুকে নিয়ে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে পৌঁছার পর মনে হলো আশপাশের কোন শহরে বেড়াতে গেলে মন্দ হয় না। বিমানবন্দর থেকে গাড়ি ভাড়া করে নিয়েছিলাম, আর তাই ইচ্ছেমতো যে কোন শহরে যাওয়া কোন সমস্যা নয়। ইস্তাম্বুল থেকে দেড়শো কিলোমিটার একটু দূর হলেও বুরশা শহরটি বেশ বিখ্যাত এবং সেখানে অনেক কিছুই দেখার আছে। পরে আমার সাথে যোগ দিলো স্থানীয় বাংলাদেশিরা।
গাড়ি নিয়ে বুরশার দিকে যাওয়ার পথে জানতে পারলাম, আমার এক পরিচিত এই শহরে থাকেন। ভাবলাম তার বাসায় একটু দেখা করে আসি। তিনি বললেন, চলুন আপনাদের একটি সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাই। তারপর তার কাছেই শুনলাম উপরের এই ‘কান্নার গাছটির’ কথা। এমন একটি গাছের কথা শুনে কারই না গাছটিকে দেখতে ইচ্ছে করবে!

মসজিদ ও পাশে গ্রিক ধ্বংসাবশেষ ছবি: লেখক
বুরশা শহর থেকে বিকেলের দিকে পাহাড়ি ছোট্ট রাস্তা ধরে গোলিয়াজির পথে রওয়ানা হলাম। বুরশা থেকে ৪০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আনুমানিক এক ঘণ্টার পথ পেরোলেই গোলিয়াজি পৌঁছানো যায়। ড্রাইভিং করতে করতে উলুদাগের নদীপথ আর সবুজ পাহাড়ের পাশ দিয়ে যেতে সর্পিল হাইওয়েতে চলছিলাম। রাস্তার দুইধারে পাইনবন, জংলি ফুলগুলো দেখতে খুবই সুন্দর লাগছিল। দূর পাহাড়ের নীল আভা এক অন্যরকম মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। দূর থেকে দেখা যায় মেঠোপথ, গাছপালা ও গ্রাম্য কাঠের বাড়িঘর। মাথার উপর সামান্য মেঘলা আকাশ, মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি আমাদের যাত্রাপথকে শান্তির ঢেউয়ে মুড়িয়ে দিতে চাচ্ছে।
একটু পর হ্রদের পাশে গাছের জায়গাটিতে পৌঁছলাম। এই হ্রদটির নাম ‘উলবাত’। হ্রদের পাশে কয়েকটি নৌকা বেঁধে রাখা রয়েছে। রাস্তার ধারের এক বাঁক ঘুরতেই মুখোমুখি হলাম খ্রিস্টান যুগের একটি স্মৃতিস্তম্ভের সঙ্গে, সেন্ট জর্জের গির্জার ভাঙ্গা অংশ। গির্জাটি একসময় গ্রিক আদি বাসিন্দাদের প্রধান পুণ্যক্ষেত্র ছিল এবং সম্প্রতি সংস্কার করা হয়েছে। গির্জার ধ্বংসাবশেষ দেখে বোঝা যায়, গোলিয়াজি কোন এক সময় গ্রিক বসতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। আশপাশের গাছের ডালপালা মুড়ে থাকা পুরনো শহরের টুকরো দেয়াল আর পাশেই ছোট্ট মসজিদ দেখে মনে হয়, শহরটি প্রকৃতই শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে তৈরি এক ঐতিহাসিক চিত্রশালা।
সন্ধ্যায় সূর্যের রুপালি আলো হ্রদের পানিতে মিশে যাচ্ছে। জীবনানন্দের শিশিরে শব্দের মতো সন্ধ্যা নামছে। গাছগাছালিতে শিহরিত হালকা হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল। একটু হেঁটে পৌঁছে গেলাম গোলিয়াজি গ্রামের প্রবেশদ্বার সংলগ্ন বটগাছটিতে, যা ‘কান্নার গাছ’ নামে পরিচিত। এই গাছটির গল্পটাই আপনাদের শুরুতে বলেছি। তবে সত্যি বলতে কি, নরম সবুজ সতেজ গাছটি দেখে মনেই হয়নি যে তেমন পুরনো। দূর থেকে আমার কাছে সাধারণ বটগাছের মতো মনে হচ্ছিল।
তবে তার বিশাল আকার দেখে হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। পাশে যেতেই বিশাল প্রশস্ত কাণ্ড ও অনেক বড় বড় শেকড় যখন দেখলাম, তখন আমার ভুল ভাঙলো। মনে হলো, হয়তো এতটাই পুরনো হতে পারে। কাণ্ডের কাছে বিশাল ভাঙা গহ্বর চোখে পড়লো। দূরের লাল আকাশ আর তাতে গাছের প্রতিবিম্বিত জলরাশিতে পরিবেশ যেন এক বিমুগ্ধ সুরম্য ক্যানভাস হয়ে উঠছে।
এই বটগাছটির প্রকৃত বয়স বিষয়ে সঠিক তথ্য সহজলভ্য নয়। তবে অনেক গবেষক ধারণা করেন যে, গাছটি ৭৫২ বছরেরও বেশি পুরনো। স্থানীয় গবেষকরা গাছের কাঠের কিছু নমুনা সংগ্রহ করে তার বয়স নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন, যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে ‘কার্বন-ডেটিং’ বা ‘কার্বন-১৪’ পদ্ধতি। ‘কার্বন-ডেটিং’ হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যার মাধ্যমে জীবদেহে থাকা কার্বন আইসোটোপের বৈশিষ্ট পরিমাপ করে বস্তুটির বয়স নির্ধারণ করা যায়। গাছ বা অন্য কোনো জীবন্ত বস্তুতে কার্বন-১২ এবং কার্বন-১৪ এই দুইরকম পরমাণু থাকে। বায়ুমণ্ডল ও পরিবেশ থেকে গাছ জীবদ্দশায় এই দুই রেডিওনিরপেক্ষ পরমাণু গ্রহণ করে এবং তার অনুপাত নির্দিষ্ট থাকে।

‘কান্নার গাছ’-এর পাশে লেখক ও তার স্ত্রী মুশফেকা মিতু।