লিংক: https://samakal.com/opinion/article/327081/
প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫
কম্পিউটার ভাইরাসের কথা কেন কম শোনা যায়
মশিউর রহমান

একসময় কম্পিউটার ভাইরাস ছিল প্রযুক্তি জগতে ভয়ের প্রতিশব্দ। নব্বই দশক কিংবা ২০০০ সালের প্রথম ভাগে যারা বড় হয়েছেন, তারা নিশ্চয় মনে করতে পারবেন যে একটি ইমেইলে ভুল করে ক্লিক করলেই কম্পিউটার বিকল হয়ে যেত; গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নষ্ট হতো কিংবা মনিটরে ভেসে উঠত অদ্ভুত সব বার্তা। কম্পিউটার ভাইরাস ছিল যেন ডিজিটাল দুর্বৃত্তদের খেলার মাঠ। কিন্তু আজকের যুগে যখন আমরা ক্লাউড, মোবাইল অ্যাপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত সিস্টেম এবং জটিল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল, তখন মনে হয় কম্পিউটার ভাইরাসের সেই ভয়াবহ যুগ কোথায় হারিয়ে গেছে। সত্যিই কি তাই?
এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের বুঝতে হবে প্রযুক্তি-পৃথিবী যেমন বদলেছে, ভাইরাসও তেমনি বদলেছে। আগের মতো আর রঙিন গ্রাফিকস দেখানো বা কম্পিউটার লক করে দেওয়া ভাইরাস তৈরি করে কেউ লাভবান হয় না; বরং ভাইরাস এখন পেয়েছে আরও গভীর, আরও নীরব, আরও ধূর্ত রূপ। কম্পিউটার ভাইরাস হারিয়ে যায়নি; তারা শুধু ভিলেনের চরিত্র বদলে আরও বিপজ্জনক স্তরে উন্নীত হয়েছে।
কম্পিউটার ভাইরাসের প্রাথমিক যুগ একটু ঘুরে আসি। আমরা দেখতে পাব দুষ্টু প্রযুক্তিবিদরা (যাদের হ্যাকার নামে ডাকা হয়) সেই যুগে ভাইরাস বানাতেন যেন শখের বশে। অনেক সময় এসব ভাইরাস ক্ষতিকর ছিল না। যেমন স্ক্রিনে কোনো মজার অ্যানিমেশন ভেসে ওঠা। কিন্তু খুব দ্রুতই ভাইরাস নির্মাতারা বুঝলেন, ডিজিটাল জগতের এই ছোট ক্ষতিকর সফটওয়্যারগুলো হতে পারে ক্ষমতাশালী অস্ত্র। মানুষ যত বেশি ইন্টারনেটে নির্ভরশীল হলো, ভাইরাসের লক্ষ্য তত বড় হলো। ধীরে ধীরে এই শখের বশে তৈরি করা ভাইরাস রূপ নিল এক ধরনের ডিজিটাল অপরাধে।
এখনকার ভাইরাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো উদ্দেশ্য। আগের ভাইরাস নির্মাতারা মনোযোগ চাইতেন। তাদের ভাইরাস আলোচনার কেন্দ্র হতো, গণমাধ্যমে খবর হতো, ব্যবহারকারীর কম্পিউটার বিকল হলে তারা গর্ব অনুভব করতেন। আজকের হ্যাকারদের লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা চায় অর্থ, তথ্য, নিয়ন্ত্রণ এবং চরম গোপনীয়তা। সাইবার ক্রাইম এখন বছরে বিলিয়ন ডলারের শিল্প, যেখানে ভাইরাস শুধু একটি অস্ত্র। ফলে আধুনিক ভাইরাস যতটা সম্ভব নীরব থাকতে চায়; চুপিসারে প্রবেশ করে তথ্য চুরি, ব্যাংকিং সিস্টেম হ্যাক কিংবা শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে বিঘ্ন ঘটাতে।
গত এক দশকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। আমরা আজ অ্যান্টিভাইরাস, ফায়ারওয়াল, ক্লাউডভিত্তিক সিকিউরিটি, জিরো-ট্রাস্ট আর্কিটেকচার এবং এআই চালিত সিস্টেম ব্যবহার করে সেগুলো শনাক্ত করতে পারি। ফলে আগের মতো পুরোনো ধাঁচের ভাইরাস টিকে থাকা কঠিন। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হলে আক্রমণও উন্নত হয়। এটিই প্রযুক্তির জন্য ধ্রুব সত্য। ফলে ভাইরাস এখন আর একা আক্রমণ করে না। তারা এখন পুরো নেটওয়ার্ক, সার্ভার, অ্যাপ্লিকেশন, এমনকি মানুষের মনোবিজ্ঞানের ওপর নির্ভর করে। আধুনিক ভাইরাসের প্রকৃতি বুঝতে হলে তাই আমাদের দেখতে হবে র্যানসমওয়্যার, বটনেট, স্পাইওয়্যার এবং সাপ্লাই চেইন আক্রমণের ভয়ংকর বাস্তবতাকে।
র্যানসমওয়্যার আজকের বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ ডিজিটাল অস্ত্রগুলোর একটি। এটি নীরবে সিস্টেমে ঢুকে সব ফাইল এনক্রিপ্ট করে দেয়, তারপর মুক্তিপণ দাবি করে। বিশ্বজুড়ে হাসপাতাল, সরকারি দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়– কোনো ক্ষেত্রই নিরাপদ নয়। আগের ভাইরাস হয়তো আপনাকে ভয় দেখাতে চাইত; র্যানসমওয়্যার আপনার জীবন থামিয়ে দেয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক সত্য হলো, মানুষ যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, এই মুক্তিপণভিত্তিক আক্রমণের লাভ তত বাড়ছে।
অন্যদিকে বটনেট বা দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত কম্পিউটারের বিশাল বাহিনী আধুনিক ভাইরাসকে দিয়েছে এক নতুন ক্ষমতা। লাখ লাখ সংক্রমিত কম্পিউটারকে ব্যবহার করে বড় ওয়েবসাইটে আক্রমণ চালানো যায়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা অচল করা যায় কিংবা ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও তৈরি করা সম্ভব। ভাইরাস নির্মাতারা এখন ব্যক্তি ব্যবহারকারীর কম্পিউটার নষ্ট করতে চান না। বরং সেটিকে তাদের সেনাবাহিনীর একটি ‘সৈনিক’ হিসেবে ব্যবহার করতে চান, যেটি তারা পরে অন্যকে আক্রমণ করতে ব্যবহার করতে পারবেন।
স্পাইওয়্যার বা নজরদারি সফটওয়্যারও আধুনিক ডিজিটাল বিশ্বের একটি নতুন মুখ। আগের ভাইরাস যদি আপনার কম্পিউটার ধ্বংস করত, এখনকার ভাইরাস আপনার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি মাউস ক্লিক, প্রতিটি ছবি, প্রতিটি পাসওয়ার্ড নীরবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। একসময় গুপ্তচরবৃত্তি ছিল রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সম্পর্কিত। এখন তা ব্যক্তিগত জীবনেও প্রবেশ করেছে। স্পাইওয়্যার শুধু অপরাধীদের হাতে নেই; অনেক রাষ্ট্রীয় সংস্থাও এটি ব্যবহার করছে। যার ফলে মানুষের ডিজিটাল স্বাধীনতা নতুন সংকটে পড়েছে।

আধুনিক ভাইরাসের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ দেখা যায় সাপ্লাই চেইন আক্রমণে, যেখানে ভাইরাস সরাসরি আপনার কম্পিউটারে ঢোকে না; বরং আপনি যেসব সফটওয়্যার বা আপডেট ডাউনলোড করেন, তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। এটি আতঙ্কের। কারণ আপনি যাদের ওপর বেশি ভরসা করেন, সেই সফটওয়্যার নির্মাতারা আক্রান্ত হলে আপনি কিছু বুঝতেই পারবেন না যে ভাইরাস প্রবেশ করেছে। ২০২০ সালের SolarWinds আক্রমণ বিশ্বকে দেখিয়েছে আধুনিক ভাইরাস শুধু ব্যক্তিগত ডিভাইস নয়; পুরো একটি দেশকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
তাহলে কি আমরা নিরাপদ? না, তবে আমরা সচেতন। প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে, নিরাপত্তা পদ্ধতি তত জটিল হয়েছে। এআই চালিত ভাইরাস শনাক্তকরণ এখন বহুল ব্যবহৃত। হয়তো আপনি নিজে করছেন না, কিন্তু আপনাকে যারা ইন্টারনেট সংযোগ দিচ্ছে, আইএসপি প্রতিষ্ঠান কিংবা আপনার অফিসের সিস্টেম, ক্লাউড সিস্টেমে আগাম হুমকি চিনে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। পাসওয়ার্ডের জায়গায় এসেছে বায়োমেট্রিক যাচাই। কিন্তু হ্যাকাররা থেমে নেই। তারা শিখছে, বদলাচ্ছে এবং নতুন নতুন আক্রমণ পদ্ধতির উদ্ভাবন করছে।
প্রশ্ন হলো, এত উন্নতির পরও কেন ভাইরাস পুরোপুরি হারিয়ে যাচ্ছে না? কারণ প্রযুক্তি নিজেই একটি জীবন্ত সত্তার মতো, যতই এটি বড় হয় ততই নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়। আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করে। কোটি কোটি ডিভাইস ইন্টারনেট অব থিংসের মাধ্যমে সংযুক্ত। বাড়ির লাইট থেকে শুরু করে পেসমেকার পর্যন্ত সবকিছুই এখন নেটওয়ার্কে থাকে। ফলে একটি মাত্র দুর্বলতা পুরো সিস্টেমকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে। ভাইরাস তাই আর শুধু কম্পিউটারের ঝুঁকি নয়। এটি হয়ে উঠেছে সমাজের ঝুঁকি, অর্থনীতির ঝুঁকি, এমনকি মানুষের জীবন ঝুঁকির অংশ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ডিজিটাল রূপান্তর দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সরকারি সেবা; সবকিছুই অনলাইনে। কিন্তু নিরাপত্তা সচেতনতা, দক্ষ জনবল এবং সাইবার আইন; সর্বক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে। আমরা যদি মনে করি, ভাইরাসের যুগ শেষ হয়ে গেছে; বড় ভুল করছি। বরং ভাইরাস এখন আরও নীরব, আরও বুদ্ধিমান, আরও ক্ষতিকর।