প্রতিবছর শীতের পাখিদের মতন বাংলাদেশে শীতকালে ভ্রমণটা একটা বার্ষিক রুটিনে দাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সবকিছু এলোমেলো করে দিল কোভিড। মাঝখানে স্বল্প সময়ের জন্য বাংলাদেশে যাবার সুযোগ হলেও আমার সন্তানদের সাথে বাংলাদেশের পরিবার পরিজনের একটা দুরত্ব হয়ে গিয়েছিল। সুন্দর জীবনের জন্য প্রবাসে থাকলে তার অপরদিকে এই “দুরত্ব” তৈরী হয়ে যাওয়াটা একটি সমস্যা বটে। সেই দূরত্ব কিছুটা লাঘব করার জন্য হলেও সিদ্ধান্ত নিলাম বেশীদিন না হলেও দুই সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশে যাবো। তবে এইবারের ভ্রমণটা হবে একেবারেই আত্মীয়দের সাথে reconnect করা। কতটুকু সফল হল তা জানি না। তবে মেহরাব মাশরাফি যখন বললো, তাদের রাজশাহী ও গোদাগাড়ি ভালো লেগেছে তখন সত্যিই খুব ভালো লাগায় ভরে গেল।
রাজশাহীর যে জিনিসগুলি পর্যবেক্ষণ করলাম
- রাজশাহীর গ্রন্থাগারগুলি বন্ধ হয়ে গেছে, তার বিপরীতে কোচিং সেন্টার ও রাস্তার পাশে সাইনবোর্ডে ভরে গেছে। সাহেববাজারে এক বিশাল মাল্টিমিডিয়া দেখলাম। শহর জুড়ে অনেক পোস্টার, সবগুলিই সংগঠনের থেকে নিজের ছবি প্রচার। আমরা প্রতিষ্ঠান নয়, ব্যাক্তির ইমেজ ভালো করতে ভালোবাসি।
- রাজশাহী একেবারেই হটাৎ করে bubble এর মতন ফ্লাট বাড়ি হচ্ছে। কতদিন এই বাবল টিকে থাকে তা দেখার বিষয়। কেননা এই ফ্লাটগুলির ক্রেতা এর সংখ্যা সময়ের সাথে সাথে কমে আসবে তাই প্রকৃতির নিয়ম।
- পদ্মাপাড়ে আম জনতার থেকে কাপল বা জুটি দিয়ে ভরে গেছে।
- স্থানীয় রাজশাহীবাসিরা জমি বিক্রি করে একটা বড় অংকের টাকা ব্যাংকে জমা রেখে তার সুদেই সংসার চালাচ্ছে। তারা কর্মবিমূখ হয়ে স্থানীয়রা অনুৎপাদনশীল হয়ে যাচ্ছে (আমার ভাষায় আইলসা হচ্ছে)। রাজশাহীতে কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠান তৈরীতে এই টাকাগুলি কাজে লাগতে পারতো।
- স্থানীয় রাজশাহীর লোকজন অল্পতেই সুখি হবার সেই পুরান প্রবণতা এখনও আছে। মানুষের মৌলিকগুণ মনে হয় পরিবর্তন হয়না।
- রাজশাহীতে যে সমস্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে তার প্রায় সবই বহিরাগতদের দ্বারা।
- রাজশাহীতে প্রচুর বহিরাগত শ্রমিকরা শহরে আসছে মোটর চালিত রিকশা চালাতে, স্থানীয়ভাবে উল্কা নামেই পরিচিত। একজনের সাথে কথা হল তিনি চারঘাটে পরিবার নিয়ে থাকেন। প্রতিদিন ভোর ৫ টায় রাজশাহীতে আসেন। উল্কার মালিক থেকে ৪০০ টাকায় উল্কা লিজ নিয়ে রাজশাহীতে সারাদিন রিকশাটা চালান। রাতে ফেরত দিয়ে আবার চারঘাটে ফিরে আসেন। আয় হয় দৈনিক গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা বা মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকা। এই দিয়ে তার সংসার চলে। সমস্যা হল এরা অপ্রশিক্ষিত এবং মূলত কায়িক শ্রমিক। তাদের অদক্ষতার কারনেই রাজশাহীতে দূর্ঘটনা হচ্ছে।
- বেশ কিছু চার তারার হোটেল রাজশাহীতে দেখলাম। একটিতে গিয়েছিলাম। সেখানে খাবার দাম সিঙ্গাপুরের থেকেও বেশী লাগলো।
- শীতকালে প্রচুর বিয়ের আয়োজন। কমিউনিটি সেন্টারের সামনের দিকে যতটা যৌলুশ দেখলাম, পিছনের দিকে ভয়াবহ অবস্থা। “সামনে ঠিকঠাক পিছনে সদরঘাট”
- মোট কথা নব্যধনিক শ্রেণির চাপে রাজশাহী শহর খুব শীঘ্রই ঢাকার মতন বিষাক্ত শহরে পরিণত হওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এইবার পাওয়ার লিস্টটি দেওয়া যাক,
- আত্মীয় স্বজনদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। তাদের অতিথি আপ্যায়ন সত্যিই আমার জীবনটা আরেকটি পূর্ণ করে দিল।
- গ্রামের বিয়ের অনুষ্ঠানে বিয়ের গীত শোনার বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছিল।
- শীতের মৌসুমের প্রায় সব পিঠা খাওয়ার সুযোগ হল।
- মা ও শাশুড়ির দেওয়া এক পালা খাবার নিয়ে সিঙ্গাপুরে ফিরে এলাম।
২ জানুয়ারী ২০২৩