প্রতিবছর ঘটা করে শীতের সময় ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে বউবাচ্চাদের নিয়ে ভ্রমণ করাটা আমাদের একটা বার্ষিক রুটিনে পরিনত হয়েছে। সম্ভবত শুধু মাত্র আমিই নয়, আমার মতন প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশীরা শীতের এই সময়টাতে বাংলাদেশে ভ্রমণ করতে যায়। শীতের অতিথী পাখিদের মতন আমরা প্রবাসীরা নিজের গ্রাম কিংবা শহর, স্মৃতিময় জায়গাগুলি ও আত্মীয়দের সাথে মিলবন্ধন করার উদ্দ্যেশেই ফিরে যায় সেই নিজভূমে। সেইসাথে নতুন প্রজন্মদেরকে নিজভূমের সাথে পরিচয় করার একটি উদ্দ্যেশ্য থাকে।
প্রায় তিন মাস আগ থেকেই টিকেট রিজার্ভ করে কেটে রেখেছিলাম। যতই দিনগুলি এগিয়ে আসছিল ততই আমার গিন্নীর প্রস্তুতি এগিয়ে যাচ্ছিল। কোন ল্যাগেজ নিব? কাকে কি গিফট দেব? কোথায় কখন থাকবো তা নিয়ে শিডিউল করার জন্য বাংলাদেশে ফোনের পরে ফোন। ওয়াটসএ্যাপ এর কল্যাণে এখন ফোনের বিল নিয়ে মাথাব্যাথা নেই বলে রক্ষা, নতুবা আগের মতন আন্তর্জাতিক ফোন কল হলে ফোনের বিল নিলে হার্টফেল করতে হোত। শীতের সময় বাংলাদেশে বিয়ের ধুম পড়ে। বাংলাদেশে যাবার আগেই দুটি বিয়ের দাওয়াত পেলাম। সুতরাং জম্পেস করে বিয়েতে আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা হবে, এবং বিয়ে বাড়ির খাবার খাওয়া যাবে তাই খুব আগ্রহসহকারে অপেক্ষা করছিলাম।
গিফট কি দেব তা দিয়ে অনেক গবেষনা করতে করতে সীদ্ধান্ত নিলাম দেশ থেকেই সোনার কোন একটা গয়না কিনে দেব। সিঙ্গাপুরে যদিও ভালো গুণগত মানে সোনার গয়না পাওয়া যায়, কিন্তু আমাদের দেশের ডিজাইনগুলি বেশি নজরকাড়া হয় এবং দেশীয় ডিজাইনগুলি এইখানে পাওয়া যায় না। আমার বৌ আবার রাজশাহীর মেয়ে, এবং সে দেশেই কেনাকাটি করতে পছন্দ করে, তাই আমি তার মতামতকেই প্রাধান্য দিলাম।
ঢাকাতে পৌছে প্রথমেই চলে গেলাম রাজশাহীতে এবং সেখান থেকে গোদাগাড়িতে আমাদের প্রাচীন ভিটাতে। সেইখানেই প্রথম বিয়েটি আমরা পেলাম আমার এক ফুপাত ভাইয়ের। মজার ব্যাপার হল তার নামেই আমার নাম। গায়ে হলুদের আগেরদিন সন্ধ্যায় আমার ফুপু বাসায় এসে হাজির মা ও আমার বৌকে নিয়ে বাজার করবে বলে। আমাদের গ্রামের বাজারেই তারা কেনাকাটি করবে বলে।
গোদাগাড়িতেই দেখলাম হরেক রকমের বাজার বেড়েছে। আগে কাপড়চোপড় কেনার জন্য লোকজন রাজশাহী শহরে গেলেও এবার দেখলাম গোদাগাড়িতেই সব ধরনের কাপড় চোপড় পাওয়া যাচ্ছে, এবং তাদের জন্য আর রাজশাহীতে যাবার প্রয়োজন হয়না। গোদাগাড়িতেই ক্রেতার সংখ্যা যে বেড়েছে তা বলায় বাহুল্য। ফুপু আমাকে খুব আদর করেন এবং যতবার তার বাড়িতে গিয়েছি তখনই উজার করে ভালোবাসা দিয়ে ভরে দিতেন। পরের দিন গায়ে হলুদ এর দাওয়াত দিলেন যাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয়, থুবড়া। আমরা সন্ধ্যা বেলাতেই যেয়ে হাজির। মা ও ছেলে মেয়েদের নিয়ে আমরা হাজির হলাম। আমাদের বাসার খুব কাছে বলেই আর বড় কোন গাড়ির ব্যবস্থা করিনি। গোদাগাড়িতেই মোটর চালিত রিকসা যাকে স্থানীয়ভাবে উল্কা বলে। বিশেষভাবে এই যাববহন এর কথা উল্লেখ করার কারণ অবশ্যই আছে, যা পরে বলবো।
বাড়িটি ছোটখাট কিছু আলোকসজ্জা করেছে, তাই গ্রামের মধ্যে গায়ে বিয়ে বাড়ির বাসা খুঁজে পাওয়া কঠিন হল না। আমরা ঢুকেই দেখি বর আর তার পাশে তার ভাবিরা জায়গা দখল করে রেখেছে। বরের সামনে রেখেছে স্থানীয় পিঠা পায়েস, মিস্টি থেকে শুরু করে হরেক রকমের খাবার। ফুপুর দিকের প্রায় সব আত্মীয়দের সাথে দেখা হল। অনেকবছর পরে তাদের দেখে সত্যিই আবেগে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার ছেলেদের পরিচিত করে দিচ্ছিলাম কে কোনটি এবং সেই আত্মীয়দের সাথে কানেকশনগুলি কিভাবে। একটু পরে স্থানীয় মহিলারা বিয়ের গীত শুরু করলো। গোদাগাড়িতে এই বিয়েবাড়িতে বিশেষ করে গায়েহলুদের সন্ধ্যায় গীত এর প্রচলন বেশ আছে। যখন কেউ খাবারটি দিতে যাবে তখন তার সাথে বর বা কনের সম্পর্ককে উল্লেখ করে গীতের কথাগুলি পরিবর্তিত হয়। যেমন আমার মা যখন বর কে খাওয়াতে গেল তখন বরের মামি হিসাবে উল্লেখ করে গান গাচ্ছিল। লাইভ কনসার্ট এর মতন ব্যাপার। বাংলাদেশের গ্রামীন এই কৃষ্টিগুলি এখনও টিকে আছে এবং সেগুলি নিজের ছেলেদের দেখানোর এক দূর্লভ সুযোগ পেলাম। আধুনিক সমাজ আমাদের কাছ থেকে এই কৃষ্টিগুলি কেড়ে নিচ্ছে।
বিদেশ থেকে যাবার কারণে কিনা জানিনা, আমাদেরকে আলাদা করে আপ্যায়ন করে খাবার দিল। গায়ে হলুদ বলে খুব সাধারণ ডালভাত এর ব্যবস্থ করেছিল। তবে গ্রামের এই কলাই এর ডাল ও সাধারণ আলুর তরকারি আমার কাছে অমৃত বলে মনে হচ্ছিল। আমার ছেলেরাও দেখলাম তা বেশ পছন্দ করেছে। আমার ছেলে কয়েকবার চেয়ে নিল।
সব আত্মীয়দের দেখা করার আনন্দ নিয়ে আবার ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, সেই সময়েই হল বিপত্তি। অনেক রাত বলে গ্রামের রাস্তায় আর কোন যানবাহন নেই। আমাদের মনেই ছিল না যে গ্রামের লোকজন খুব তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে যায় এবং ঘুমাবার প্রস্তুতি নেয়। শহরের তুলনায় গ্রামের লোকজন সন্ধ্যার পরে বাহিরে থাকার প্রবণতা খুব কম। ব্যাপারটা জানতাম কিন্তু একেবারেই মনে ছিল না। আমরা শহরে বড় হয়েছি এবং সিঙ্গাপুরের মতন মেট্রোপলিটন শহরে থাকি যেখানে গভীর রাত পর্যন্ত যানবাহন থাকে। রাস্তায় আমরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম কোন যানবাহন যদি চোখে পড়ে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরেও যখন পেলাম না তখন আমাদের হবু বর নিজেই উদ্দ্যোগী হয়ে তার মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লো কোন যানবাহনকে ডেকে নিয়ে আনতে। একটু দূরেই রয়েছে সিএনবি এর মোড় সেখানে গেলেই পাওয়া যাবে। বর আমাকে মোটরসাইকেলে পিছনে নিয়ে নিল। গোদাগাড়ি এর শীত কত যে কনকনে তা হাড়ে হাড়ে টের পেলুম। শীত মনে হচ্ছে একেবারে হাড়ের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরে সারাটা বছরই একই তাপমাত্রা থাকে, তাই শীতের সাথে অভ্যস্ত নয়। অবশ্য জাপান ও আমেরিকাতে এর থেকেও বেশী শীত পড়ে এবং বরফ পড়লে সত্যিই কষ্ট হয়। যাই হোক আমরা একটু পরেই যেয়ে একটি মোটরচালিত বড় রিকসা বা উল্কা পেলাম।
তবে এইখানে অভিজ্ঞতা হল যে আমাদের বাংলাদেশীদের একটা problem solving skill রয়েছে। আমরা খুব দ্রুত সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের নিজস্ব উপায় আমরা ঠিকই বের করে নিই। যে বর বিয়ে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গ উপভোগ করছে, আজকের অনুষ্ঠানে যে মূল নায়ক, সে এইভাবে সমস্যাটা সমাধান করার জন্য উদ্দ্যোগী হবে, তা সত্যিই বাংলাদেশীদের একান্ত নিজস্ব গুণ, সেটা হয়তো আত্মীয়দের জন্য উজাড় করা ভালোবাসা, তবে আমার কাছে মনে হয়েছে তা আমাদের সমস্যা সমাধানের গুণই মনে হয়।
কথা প্রসঙ্গে মনে পড়লো, আমি পিএইচডি করবার সময় মাটির নীচে একটি গবেষনাগারে কাজ করতে হোত। সেই সময়ে হটাৎ আমাদের পানি ছাচার মোটরগুলি নষ্ট হয়ে পানি বের হয়ে যাচ্ছিল। সবাই যখন প্রোটকল মেনে যন্ত্রটা ঠিক করবার দিকে মনযোগী, আমি তখন উল্টোদিকে দৌড়ে গবেষনাগারের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও কম্পিউটারগুলি সাটডাউন করতে দৌড়ালাম। কিছুক্ষণ পরে যখন দেখা গেল পানি সব জায়গাতেই ছড়িয়ে গেছে, তখন আমাদের খুবই মূল্যবান যন্ত্রগুলি অক্ষত আছে। সবাই তখন আমার তৎক্ষণাত সিদ্ধান্ত এর জন্য প্রশংসা করেছিল। পরে মনে হয়েছে আমাদের মনে হয় ডিএনএ তেই এমন সমস্যা সমাধানে সিদ্ধান্ত নেবার গুণ ঢুকানো আছে। আজকের দিনে অনেক ভারতীয় ও বাংলাদেশী বংশদ্ভূতরা বড় প্রতিষ্ঠানের লিডারহিসাবে কাজ করছে। তাদের এই সমস্যা সমাধান করার গুণের কারণেই প্রশংসিত হয়েছে। আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশীদের এই গুণটাকে আমরা আরো ভালো কোন কাজে লাগাতে পারি। যুগের পরে যুগ প্রাকৃতিত দূর্যোগ সহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান করতে আমাদের ডিএনএ তে এইগুলি ঢুকে গেছে যা আমাদের পরবর্তি প্রজন্মদের মধ্যেও বাহিত হবে নিশ্চয়।
এর পরের দিন ছিল বিয়ের বরযাত্রী আমরা সেটাতেও অংশ নিই। যদিও কনের বাসা হেটেই যাওয়া যায়, তারপরেও আমার কাকা দেখি মাইক্রোবাস ভাড়া করেছেন। সেটাতে করেই আমরা বরযাত্রী হিসাবে বরকে নিয়ে কনের বাসায় রওনা দিলাম। গ্রামের ভাষায় বলে ঢুলিবিবি। ঢুকতেই দেখি একটা স্বাগতম গেট করে রেখেছে, সেখানে বর ফিতা কেটে ভিতরে ঢুকলো। এরপরে তাকে ও তার দুলাভাই (বরের গার্জেন হিসাবে) কে বরন করে নেবার জন্য একটি স্টেজ করেছে। সেখানে তাদেরকে সরবত খাওয়াল এবং মিস্টিমুখ করে তারপরে আমাদের বাসায় নিয়ে গেল। বাসায় অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের সাথে আমাদের পরিচয় করে দিল।
কোন রকম কৃত্রিমতা নয়, একেবারেই মন খুলে সবাই মিল মহব্বতে মেতে উঠলো। একটু পরে আমাদেরকে হালকা নাস্তা দিল। কাজের ফাকে আমি তাদের বাসায় ঢুকে দেখছিলাম বাসাটা কেমন। দেখলাম বাসায় মেয়ে পক্ষের আত্মীয় স্বজনরা দূরদূরান্ত থেকে এসেছে কিন্তু তাদের মুখে কোন ক্লান্তি দেখলাম না। সবাই বিয়ের এই আনন্দের অনুষ্ঠানে এসে খুশীতে মেতে উঠেছে। মেয়েরা পড়েছে হরেক রকমের দেশী পোষাক যেখানে লাল রংয়ের প্রাধান্যই বেশী দেখলাম। তবে একটি জিনিস দেখে সত্যিই অবাক হলাম যাকে বলে টাসকি লাগা। তা হল কনের বাসার প্রায় প্রতিটি রুমেই দেখলাম বড় বড় বইয়ের আলমারি, কোন টিভি নেই। সেই আলমারিগুলিতে টেক্সট বইয়ের পাশাপাশি দেখলাম রয়েছে হরেক রকমের বই- দর্শন, ইতিহাস থেকে শুরু করে ইংরেজী কিছু নোভেল বই দেখলাম। গ্রামে কারো বাসায় বই বলতেই টেক্সট বই এবং ধর্মীয় বইগুলির আধিক্য বেশী। কিন্তু এই বাসাতে দেখলাম বইয়ের কালেকশন বেশ সমৃদ্ধ। বুঝতে পারলাম এই বাসাতে জ্ঞান চর্চাকে গুরুত্ব দেয়। এটা আমার একেবারে কল্পনা করিনি। নতুন ভাবে যেন গ্রামের এই বাসাটিকে আবিষ্কার করলাম। বর যে ভালো একটি কন্যা পেয়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ থাকলো না।
এবং এর পরে বিয়ে পড়ানোর কাজ শুরু হল। যেহেতু আমি বরের বড় ভাই হই, তাই আমাকেও সাক্ষী হিসাবে নিকাহনামাকে সাক্ষর করতে হোল। জীবনে এই প্রথম আমি কারো বিয়েতে সাক্ষী থাকলাম। বর ও কনের নতুন এই জীবনযাত্রায় আমিও সংস্লিস্ট হতে পারলাম বলে খুব ভালো লাগলো। প্রথমে আমরা বরের কবুল গ্রহণ করে এরপরে কনের কবুল শুনতে গেলাম। কনে দেখলাম লাজুক কন্ঠে শব্দটি বললো। এইক্ষণটি নিশ্চয় এই মেয়েটি সারাটা জীবন মনে রাখবে। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালার কাছে তাদের মঙ্গল কামনা করে আমরা সবাই দোয়া পড়লাম।
বিয়ে পড়ানোর পরে আমাদের বিয়েল আকলিমা, বা একটু হালকা মিস্টি দিল। অনেক সময় বাতাসা, খেজুর কিংবা অন্য কোন হালকা মিস্টি দেয়। আমাদেরকে খৌকে চিনির দানায় প্যাচান এক ধরনের বাতাসা দিল। সাধারণ ছেলে পক্ষরা এই মিস্টি এর আয়োজন করে।
সেইদিন ছিল শুক্রবার জুম্মার নামাজের দিন। আমরা বাসার কাছেই মসজিদে নামাজ পড়তে গেলাম। আমার দুই ছেলে আমার সাথে গেল। ছোটখাট দুই তলার একটি মসজিদ। নামাজের আগে খুতবার সময় দেখলাম ভিডিও করে তা ফেসবুকে সম্ভবত লাইভ করছিল। ব্যাপারটা একটু নতুনত্ব লাগলো। বুঝলাম সোসাল মিডিয়া আমাদের গ্রামেও হানা দিয়েছে। নামাজ পড়ে আমরা কনের বাসায় ফিরে আসার পরে আমাদের ছাদে নিয়ে গেল যেখানে প্যান্ডেল করে খাবার এর আয়োজন করেছে। গ্রামের বিয়েতে বাসাতেই বিয়ের অনুষ্ঠানগুলি আয়োজন করা হয়। কমিউনিটি সেন্টার ব্যবহার করে না। এর একটি কারণ অর্থনৈতিক হলেও আমার কাছে মনে হয়েছে এর ফলে মানুষের হৃদতা আরো বাড়ার সুযোগ হয় এবং অনেকের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ থাকে।
আমাদের খাবার সময় আয়োজকরা খাবার তুলে দিচ্ছিল এবং জোর করেই খাবার দিচ্ছিলাম। প্রবাসে আমার ছেলেরা এমন করে খেতে অভ্যস্ত নয়। তাদেরকে বুঝিয়ে বললাম এইভাবে খাবার তুলে দেওয়া এক ধরনের ভালোবাসার প্রকাশ। গ্রামের কাঠের চুলাতে রান্না করার কারণে কিনা জানিনা আমার কাছে অমৃতের মতন মনে হচ্ছিল। অনেকদিন পরে গ্রামের বিয়ের খাবারের পরিচিত স্বাদ পেলাম। বিয়ের খাবার এর মেনু আগের মতনই আছে পোলাও মুরগির রোস্ট এবং খাসি কিংবা গরুর মাংস। খাবারের পরে সেই থালাতেই দই দিল। আমাদের গ্রামের দই বেশ নামকরা। খুবই সুস্বাদু লাগলো। এরপরে আমরা যখন হাত ধুতে গেলাম তখন দেখি সাবানকে তারা একটি নেটে বেধে রেখেছে। আমার ছেলে বললা আইডিয়াটা ভালো, এর ফলে সহজেই অনেক ফেনা হয়। বিদেশে এই ফেনা তৈরী করার জন্য অনেক দামী পণ্য কিনতে হয় অথচ গ্রামে খুব সহজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপারটা বেশ সহজলভ্য করে ফেলেছে। আমরা লাইন ধরে হাত ধুচ্ছিলাম কোন হুড়োহুড়ি নেই। গ্রামের মানুষেরা দেখলাম শহরের মানুষের তুলনায় অনেক বেশী ফ্লেক্সিবল এবং অন্যকে স্পেস দেবার ব্যাপারে কার্পণ্য করে না। অথচ শহরের মানুষদের মধ্যে নিজেকেই বেশী গুরুত্ব দেয় এবং অন্যকে স্পেস একেবারেই দিতে চায় না। স্পেস বলত আমি বাহ্যিক জায়গা বা দূরত্ব বুঝাচ্ছি না, বরং অন্যের কথা শোনার অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া - সেই স্পেস এর কথা বলছি।
জম্পেস খাবার পরে ভুরিভোজ করে আমি চেয়ারে বসেই একটু ঘুম নিয়ে নিলাম। মাত্র ৫ মিনিটে পাওয়ার ন্যাপ নেবার কৌশল শিখেছিলাম জাপানে থাকতে। জাপানিজরা ট্রেনে দুই স্টেশনের মাঝেই অল্প সময়েই একটু ঘুমিয়ে নেয়। আবার পরের স্টেশনে আসলে ঠিকই ঘুম থেকে উঠে নেমে পড়ে। জাপানে প্রায় ১৫ বছর ছিলাম। তাদের সাথে থাকতে থাকতে তাদের এই গুণটি আমিও শিখে ফেলেছিলাম।
একটু পরে কনেকে নিয়ে ফিরে যাবার জন্য আয়োজন হচ্ছিল। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় আমার আরেকটি জায়গায় যেতে হবে আমি আগেই বিদায় নিয়ে ফিরে এলাম। বর ও কনেকে নিয়ে আমরা ছবি তুলে নিলাম। ফিরে আসার আগে আমার কাকা কে জিজ্ঞাস করলাম, সাধারণত বিয়ের অনুষ্ঠানে গেট ধরার একটা রেওয়াজ থাকে, তা দেখলাম না যে। কাকা বলল, এই ধরনের গেট ধরা নিয়ে গন্ডগোল হবার সম্ভাবনা থাকে বলে তারা আগেই কনে পক্ষের বান্ধবীদের সাথে কথা বলে মিটমাট করে একটা প্যাকেজ করে ফেলেছিল। যদিও আমি ব্যক্তিগত ভাবে তা বিয়ের একটা মজার দিক বলে মনে করি, তবে স্বীকার করি এর ফলে অনেক খারাপ পরিস্থিতি হয়। ব্যাপারটা সুন্দভাবে ম্যানেজ করে অনুষ্ঠানটি ভালো মতন করার ব্যাপারে দুই পক্ষই যে ছাড় দিয়েছে, তাতেই খুশী।
বিয়ে বাড়িতে সবার অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং নতুন কিছু মানুষদের সাথে পরিচিত হবার অনন্দ নিয়ে ফিরে এলাম। সৃষ্টকর্তা আল্লাহর কাছে এই নতুন দম্পতির সুখের জীবনের জন্য প্রাণভরে দোয়া করলাম।