দেশ বিদেশ থেকে অনেক পর্যটক সিঙ্গাপুরে ঘুরতে আসেন। কোভিডের আগে ২০১৯ সনে এক বছরে সিঙ্গাপুরে ১৮ মিলিয়ন পর্যটক এসেছিল। কোভিড পরবর্তিতে অন্যসকল দেশের আগে সিঙ্গাপুর পর্যটকদের জন্য কোয়ারেন্টাইনের বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে নেয়। তাই বর্তমানে প্রচুর পর্যটকরা সিঙ্গাপুরে ঘুরতে আসেন। সিঙ্গাপুরে ভ্রমণ করতে আসলে পর্যটকরা মূলত মেরিনা-বে এবং সেনতোসা, চিড়িয়াখানা এবং বোটানিক গার্ডেন ঘুরতে আসেন।
তবে আমি রেকমেন্ড করবো সিঙ্গাপুরের কিছু দ্বীপগুলি ঘুরতে যাওয়ার। সিঙ্গাপুরের এই প্রাকৃতিক দ্বীপগুলির নৈসর্গিক দৃশ্য সত্যিই অতুলনীয় এবং একটি নতুন সিঙ্গাপুরকে আপনি আবিষ্কার করতে পারেন সেই জায়গাগুলিতে যেয়ে। এই দ্বীপগুলিতে কোন মানুষ বসবাস করে না, তাই সন্ধ্যার আগেই শেষ ফেরিতেই চলে আসতে হয়। দ্বীপগুলিতে ময়লা ফেলার কোন ব্যবস্থা নেই। নিজেই নিজের ময়লা বা আবর্জনা নিয়ে ফিরে আসতে হয়। তবে টয়লেট ও বিশ্রাম নেবার ভালো ব্যবস্থা আছে।
আমি আপনাদের জন্যে সিঙ্গাপুরের আশেপাশের দ্বীপগুলিতে একটি দিনের ভ্রমণের একটা প্লান দাড় করিয়েছি।
- খুব সকালেই মেরিনা সাউথ পিয়ার (Marina South Pier 31 Marina Coastal Drive, Singapore 018988) এ চলে যাবেন। সেখানে ফেরি এর টিকেট কিনে নিবেন। ফেরি এর সিডিউলটি আপনি এইখানে পাবেন: https://islandcruise.com.sg/ferry-schedule/ ফেরি যাত্রায় প্রায় ৪৫ মিনিট সময় লাগে এবং একটি রাউন্ড-ট্রিপ টিকিটের জন্য জনপ্রতি প্রায় S$১৮ খরচ হয়। অর্থাৎ একটি টিকেট কাটলেই সারাদিন ধরে সমস্ত দ্বীপগুলি ঘুরে আবার ফিরে আসতে পারবেন। যদি আপনি আগেই প্লান করে থাকেন তবে আপনি অনলাইনে টিকেটটি কাটতে পারেব। তাদের সাইট হল https://islandcruise.com.sg/ । তবে ফেরি টার্মিনালে যেয়েও টিকেট কাটতে পারেন।
- ফেরিতে বড় কোন ব্যাগ বা মালপত্র নিয়ে ভ্রমণ করা বেশ কঠিন, তাই ব্যাকপ্যাক নিয়ে নেবার অনুরোধ করবো। সাথের বড় ব্যাগ হোটেলেই রেখে আসুন কিংবা ফেরী টার্মিনালে লকারে রাখবার ব্যবস্থা আছে। সিঙ্গাপুরে যখন তখন বৃষ্টি হয় বলে সাথে ছাতাটি রাখতে ভুলবেন না। দ্বীপগুলি সিঙ্গাপুর দেশের মধ্যেই তাই আলাদা করে ভিসা এর প্রয়োজন নেই। তবে পরিচয় কনফার্ম জন্য পর্যটকদের সাথে তাদের পাসপোর্টটি রাখতে বলা হয়।
- ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে টিপস: দ্বীপের ভ্রমনে পাসপোর্টটি ভিজে যাবার সম্ভাবনা থাকে তাই একটি প্লাস্টিকের ব্যাগের মুড়িয়ে নিতে পারেন। বাংলাদেশের পাসপোর্টগুলিতে এক ধরনের আঠা ব্যবহার করা হয়, যা একটু সিক্ত হলেই কাগজগুলি নষ্ট হয়ে পরে সমস্যায় পড়তে হয়।
- একটি বড়-সর ফেরীতে ৫০ জনের মতন উঠে। বমি করে ফেলার মতন খুব বেশী ঝাকুনি হয় না, তবে একেবারেই যে হয়না তা বলা যাবে না। ফেরীর নিচের সাধারণ ডকটি এয়ারকুলার লাগান যেখানে অনেক সিট থাকে। সিটগুলি নির্দিষ্ট নয়, তাই পছন্দমত যে কোন সিটে বসে পড়ুন। উপরের ডকে বসে আপনি সমুদ্রের বাতাস উপভোগ করতে পারেন। উপরের ডকে বসলে, আমার প্রিয় গান, “ওরে নীল দোরিয়া” গানটি শুনতে পারেন। https://www.youtube.com/watch?v=EyFzC5RYJic ১৯৭৮ এ এমন একটা চমৎকার সিনেমা আবদুল্লাহ আল মামুন আমাদের উপহার দিয়েছিল। গানের কথা মুকুল চৌধুরীর কথা, আলম খানের সুর ও আব্দুল জব্বারের কণ্ঠ।
- Island Cruise ফেরীতে করে প্রথমে কুসু দ্বীপে যাবেন। সেখানে সকালটা কাটান। সেখানে রয়েছে মন্দির এবং উপাসনালয়। তবে আমার কাছে সবথেকে ভালো লেগেছে সেই সমুদ্রের স্বচ্ছ পানি। সমুদ্রের পাশেই বসার জায়গা আছে, সেখানে বসে সমুদ্রের হুহু বাতাসে সারাটা দিন কাটিয়ে দিতে পারবেন।
- এর পরে ফেরিতে করে সেন্ট জনস দ্বীপে যাবেন।ফেরি যাত্রায় প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগে।
- সেন্ট জনস দ্বীপে দুপুরটা কাটান। সেখানে দুপুরের খাবার পাওয়া যায় না বলে, ফেরিতে উঠবার আগে কিছু খাবার কিনে নিতে পারেন। সিঙ্গাপুরে ভাত, সবজি ও মাছ মাংস সহ খাবারের প্যাকেট পাওয়া যায়, যা আপনি যে কোন ফুড কোর্টে কিনতে পাবেন। সাথে পানি নিতে ভুলবেন না। ভ্রমনে বের হলে আমি ব্যাগে কিছু খেজুর ও চিড়া রেখে দিই। কোন খাবার না পেলে এইগুলি দিয়েই খাবার সেরে ফেলি। সাথে বাচ্চা থাকলে তার নিজস্ব খাবারগুলি নিতে ভুলবেন না। দ্বীপে কোন রেস্টুরেন্ট বা দোকান নেই।
- সেন্ট জনস দ্বীপের সমুদ্র সৈকতে সাঁতার কাটতে পারেন। সেখানে একটি পার্ক রয়েছে, তবে দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। সাঁতার কাটার প্লান থাকলে একটি অতিরিক্ত পোষাক সাথে নিয়ে নেবেন এবং সেই ক্ষেত্রে জুতোর পরিবর্তে সেন্ডেল পড়ে ভ্রমণ করতে পারেন।
- দুপুরটি কাটিয়ে ফেরিটি লাজারাস দ্বীপে যাবার জন্য আরেকটি ফেরি নিন। ফেরি যাত্রায় প্রায় ১৫ মিনিট সময় লাগে।
- লাজারাস দ্বীপে সন্ধ্যা কাটান, সুন্দর সূর্যাস্ত এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ উপভোগ করুন। দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য দ্বীপের চারপাশে ঘুরে বেড়াতে পারেন।
- সেখানে সূর্যাস্ত হবার আগে ফেরি নিয়ে মারিনা সাউথ পিয়ারে ফিরে যান। এইখানে উল্লেখ্য যে শেষ ফেরীটি কখন আছে তা নোট করে নিন। আমার যতদুর মনে পড়ে বিকেল ৫টায় শেষ ফেরী, তাই সূর্যাস্ত না দেখেই ফিরে আসতে হয়েছিল। সেই লাস্ট ফেরিটি মিস করলে আর আপনি ফিরে আসতে পারবেন না। তাই গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ ফেরীর সময়টি নোট করে রাখা এবং তার দশ-পনের মিনিট আগেই মোবাইলে এলার্ম দিয়ে রাখা।
- ফেরিতে করে মেরিনা বে-তে একটি ডিনার করে দিনটি শেষ করুন।
দ্বীপগুলিতে মানুষ বসবাস না করলেও ফেরিঘাটে ফেরির লোকজন থাকে এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক আছে। প্রস্তুতি হিসাবে খাবারের পাশাপাশি mosquito repeller নেবার উপদেশ দিব, কেননা অনেক সময়ই মশার কামড় খেতে হয়। এছাড়া সমুদ্রে নামবার আগে সানস্ক্রীন ক্রিম নিতে পারেন। উপরেরর লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করে দিন যিনি সিঙ্গাপুরে বেড়াতে আসবেন। একটা নতুন সিঙ্গাপুরকে আবিষ্কার করবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
উপরের তথ্য ও প্লানটি আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা।
ড. মশিউর রহমান
১৪ জানুয়ারী ২০২৩, সিঙ্গাপুর
DrMashiur.com