যাযাবর আমি পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমের হরেক রকমের দেশে কাজ করার ও বসবাস করার সুযোগ হয়েছে আমার। সেই দেশগুলিতে বসবাস করার কারণে প্রবাসের বাংলাদেশী কমিউনিটিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তবে আমার কাছে সকল দেশগুলির মধ্যে যে কারণে সিঙ্গাপুরকে এক অনন্য সাধারণ মনে হয়েছে - তা হল এখানকার বাংলাদেশী প্রবাসী লেখকদেরকে দেখে।
আমেরিকায় দেখেছি বাংলাদেশের প্রথিতযশা লেখক ও বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর লেখকরা যারা আমেরিকায় যেয়ে থিতু হয়েছেন তারাই মূলত প্রকাশনা জগতে বিচরণ করছেন। আমেরিকাতে সৌখিন লেখকও দেখেছি, কিন্তু তারা নিজেরাই গ্যাটের পয়সা খরচ করে দুই একটা বই প্রকাশিত করেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন - হয়তোবা কয়েকটি বের করাই তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য। একই অবস্থা ইউরোপের দেশগুলিতেও দেখেছি। পশ্চিমা বিশ্বের লেখকদের মধ্যে জাত-লেখকও আছেন যারা নিয়মিত বই প্রকাশিত করছেন বাংলাদেশের মূলধারার প্রকাশকদের মাধ্যমেই, তবে সেই সংখ্যাটা খুবই কম।
তবে একেবারেই অন্য চিত্র আমি দেখতে পেলাম সিঙ্গাপুরে, যেটি আজকের লেখার মূল বিষয়। এইখানে লেখকদের বড় অংশই মূলত - মাইগ্রান্ট ওয়ার্কার। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করার পরেও তারা বই লেখার সাহস ও সেই দূরুহ কাজটি কিভাবে করেন?- তাই আমার মাথায় আসেনা। তাদের ডরমেটরির পরিবেশ- যেখানে ভালমতন থাকাটাই অনেকটাই কষ্টকর, সেখানে লেখালেখির চর্চা করাটা যে কতটা কষ্টকর তা ঠিক বোঝানো যাবে না। বাবা’রা যেভাবে কখনই বুঝতে পারেনা, মা’দের সন্তান ধারণের কষ্টটা।
মালেশিয়াতে হাতে গোনা কয়েকজন মাইগ্রান্ট ওয়ার্কার লেখক পেয়েছি, তবে সিঙ্গাপুরেই অনেক লেখক। তারা নিয়মিত লেখালেখি করেন, বই মেলা করেন, সাহিত্য আলোচনার ইভেন্ট করেন, এবং বই প্রকাশিত করেন। তবে এইখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সিঙ্গাপুরের প্রবাসী এই লেখকরা যে শুধু বাংলাতেই লেখালেখি করেন, তা নয়। বরং অনেকেই ইংরেজীতেও লেখালেখি ও বই প্রকাশিত করেছেন। বাংলাদেশে তারা ইংরেজী শেখার তেমন ভালো সুযোগ পাননি, তারাও ইংরেজীতে বই প্রকাশিত করে ফেলেন - এটা দেখে সত্যিই টাসকি খেতে হয়।
সিঙ্গাপুরে যখন কোন শ্রমিক ইংরেজীতে বই বের করার দু:সাহস দেখায় তখন আমি সত্যিই অবাক হয়ে যাই। এইখানকার এলিট বা উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশীরা এই ব্যাপারটা হয়তো একেবারেই গ্রহণ করতে পারেনা। মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কারদের অনেক ইভেন্টে আমি অংশ নিয়েছি কিন্তু কোথাও আমি এই বাংলাদেশী এলিট শ্রেণীদের দেখিনি। সিঙ্গাপুরের এলিট বাংলাদেশীদের কাছে তারা যেন অনেকটাই অস্পর্ষ। এমন দূরত্বটা দেখে সত্যিই হতাস। বাংলাদেশে আমাদের সমাজের বিভাজনগুলিও এমন প্রকটভাবে প্রবাসেও দেখবো - তা আমি আশা করিনি। আর সেই কারণেই সিঙ্গাপুরে এতগুলি বাংলাদেশীদের সংগঠনের আছে যে সেই সংখ্যাটি ফিবনচ্চির সংখ্যার মত, ১,২,৩,৫,৮,১৩,২১,৩৪ এর মতন করে- দিনের পরে দিন বাড়তেই থাকে।
মূল বিষয়ে আসা যাক - কথা বলছিলাম সিঙ্গাপুরের প্রবাসী লেখকদের নিয়ে। সিঙ্গাপুরের এই লেখকরা প্রবাসে এইখানে লেখালেখির চর্চা ও বই প্রকাশের ব্যাপারে যতটা তাদের উৎসাহি দেখা যায়, বাংলাদেশে ফিরে তাদের তেমনটা একটিভ দেখা যায়না। এই কারণটা কি? - তা নিয়ে কথা বলছিলাম সিঙ্গাপুরের একজন প্রখ্যাত মাইগ্রেন্ট লেখক শরিফ ভাইয়ের সাথে। উনি নিয়মিত লেখালেখি করেন এবং বই প্রকাশিত করেন। উল্লেখ্য যে তার Stranger to My World বইটি সিঙ্গাপুরের মূল ধারার বইয়ের জগতে খুব আলোচিত হয়েছে।
আমাদের আলোচনায় আমরা যে কারণগুলি বুঝতে পেরেছি, তা অনেকটা নিম্নরূপ:
১. সিঙ্গাপুরে থাকার সময় এই লেখকরা যেমন পরিবেশ পান এবং বই প্রকাশনার ব্যাপারে সিঙ্গাপুরে যে সহযোগিতাগুলি পান তা বাংলাদেশে ফিরে যেয়ে তারা আর পাননা। সিঙ্গাপুরের স্থানীয় কিছু প্রকাশক এই মাইগ্রেনন্ট লেখকদের বিষয় নিয়ে নিয়মিত বই প্রকাশিত করেন। এখানকার এই সাপোর্টটি প্রবাসী লেখকদের উদ্ভুদ্ধ করে। বাংলাদেশে সনাতন প্রকাশনাশিল্পে এই বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করার প্রকাশক নেই।
২. সিঙ্গাপুরে প্রবাস জীবনে বাংলাদেশের প্রতি এক অন্যরকম টান থাকে (আমি যাকে প্রবাসী-অসুখ বলি) সেই হৃদয়ের টানে, লেখালেখি করেন। বাংলাদেশে ফিরে যাবার পরে তাদের এই অসুখটি সেরে যায় বলে, লেখালেখি করার সেই আগ্রহটা হারিয়ে ফেলেন বাংলাদেশে ফিরে যেয়ে।
৩. হাতে সময় থাকার কারণে এবং হোমসিক বা ঘরকাতুরে হবার কারণেও অনেকে লেখালেখি করেন। কিন্তু বাংলাদেশে ফিরে যেয়ে লেখালেখি করার মতন হাতে পর্যাপ্ত সময় পান না।
৪. সিঙ্গাপুরে এই লেখকদের যতটা প্রোমোট করা হয়, বাংলাদেশে ফিরে যেয়ে তাদের নিয়ে কাজ করার সেইরকম প্লাটফর্ম নেই। বাংলাদেশের মূল ধারার লেখকদের মধ্যে এই প্রাবাসী লেখকরা যায়গা করে নিতে পারেনা, কেননা সেখানে লেখকদের সংখ্যাটা অনেক বেশী এবং তারা অনেক আকর্ষনী বা চটুল বিষয় নিয়ে প্রকাশনায় ব্যাস্ত।
৫. আরেকটি কারন আমরা খুঁজে পেলাম তা হল, এখানকার প্রবাসী এই মাইগ্রান্ট লেখকরা বাংলাদেশে ফিরে যাবার পরে তারা আবার কিভাবে অন্য কোন দেশে পাড়ি দিবে তা নিয়েই বেশী ব্যাস্ত থাকে, এই কারণে তারা লেখালেখিতে সময় দিতে পারেনা। এটা ঠিক তাদের দোষ নয়, পরিস্থিতিই তাদের এমন দশায় ফেলে দেয়।
তবে সিঙ্গাপুরের এই প্রবাসী লেখকরা যে নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজীতে বই প্রকাশিত করে যাচ্ছে তা সত্যিই এক গর্বের বিষয়। আশা করি তারা প্রবাসে এবং দেশেও কদর এবং সম্মান পাবেন। এখন বাংলাদেশে প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে, বিষয়বস্তুগুলির বৈচিত্রও বেড়েছে, এবং দিন দিনে ছাপার গুনগত মান থেকে শুরু করে বইয়ের মানও অনেক ভালো হচ্ছে। পাঠকদের জন্য তা খুবই আশাপ্রদ কথা। সিঙ্গাপুর সহ প্রবাসের এই নবীন লেখকরা বাংলাদেশের মূলধারার প্রকাশনী জগতে জায়গার করে নেবে - তাই আশা করি।
ড. মশিউর রহমান সিঙ্গাপুর, ৮ অক্টোবর ২০২২
(লেখাটি একান্তই এই লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে লিখিত। আপনাদের গঠনমূলক পরামর্শ, মন্তব্য কিংবা অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন মন্তব্যে। অনলাইনে আজকাল খুব ক্যাচাল হচ্ছে এবং তা কারো জন্যই সুফল বয়ে আনে না। লেখকের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আপনি একমত নাও হতে পারেন এবং সেটাই স্বাভাবিক। তবে শিষ্টাচার বজায় রেখে গঠনমূলক অভিমত ব্যাক্ত করবেন তাই কাম্য।)