কলম্বাস যখন তার বাড়ি ছেড়ে সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল, তখন তার মন খারাপ করেছিল কিনা জানি না তবে যখন আমি জাপান পাড়ি দিলাম তখন একরাশ মন খারাপ আমাকে ঘিরে ধরেছিল। একদিকে নতুন দেশ দেখার উদগ্রীব আকাঙ্ক্ষা, অপরদিকে প্রিয় মানুষদের ছেড়ে প্রবাসে যাবার কষ্ট আমাকে যাতানলে পীড়া দিচ্ছিল। মেয়েরা বিয়ের পরে যেভাবে দুরু দুরু মন নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে যাত্রা শুরু করে তেমনই অবস্থা হয়েছিল আমার।

কিন্তু আমাদের বাসাতে তখন মোটামুটি একটা উৎসব বয়ে যাচ্ছিল। গ্রাম থেকে আমার মামা, চাচা সহ সকল আত্মীয়রা এসে হাজির। মিরপুরে আমাদের বাসাটা তখন বেশ ছোট। সেই বাসার একটিই বাথরুম। সকাল থেকেই এক দীর্ঘ লাইন ধরে আছে। এর মধ্যে প্রাধান্য পাচ্ছে ছোটরা এবং মেয়েরা। আমরা ছেলেরা কালো মুখ করে বসে আছি, কখন ফাঁকা হবে। বাথরুমের বেগ কমানোর জন্য মাঝে মধ্যে আঙ্গিনায় হাটছি।

মা দেখি রান্নাঘরে খাবার করতে ব্যস্ত। সকালের মিস্টি রোদ কোন এক ফাঁক দিয়ে মায়ের মুখে পড়েছে। এর মধ্যেই পুত্রশোকে মাঝে মধ্যে শাড়ি দিয়ে চোখখানি মোছছেন। বাথরুমের লাইন দাঁড়িয়ে সেটা মাঝে মধ্যে আমার চোখে পড়েছিল, কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল মনে হয় মা বুঝি রান্নাঘরের গরমে ঘামছে। মা’ একটু ঘেমে গেলে, পরে হাঁপানি উঠে যায়। পরে বিকেলে যখন বুঝলাম যে, মায়ের হাঁপানি উঠেনি, তার মানে সেটি গরমের মুখ মোছা না, সেটি ছিল সন্তানকে বিদায় দেবার জন্য কান্নার চোখ মোছা। বেচারা আমরা সন্তানদের চোখে - মায়ের সেই সব কষ্টগুলি- চোখে পড়ে না।

সাত সকালে এতগুলি মানুষের আলাদা করে নাস্তা বানান কঠিন বলে কিনা জানি না, সেদিন মা পাতলা খিচুড়ি রান্না করেছিলেন। আমাদের বাসায়া মাঝে মধ্যে সকাল বেলাতে আগের রাতের বাকি থাকা ভাত দিয়ে এক ধরনের পাতলা খিচুড়ি তৈরি করা হয়,যা আমরা তিন ভাইয়ের খুব প্রিয়। সাথে থাকে আলু ভর্তা এবং ডিম ভাজি। কেউ যদি আমাকে অমৃতের সংজ্ঞা দিতে বলে- তবে আমি সেটির কথাই বলবো।

নাস্তার টেবিলে জায়গা হচ্ছে না বলে বাহিরে পাটি বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেইখানে বিয়ে বাড়ির মতন করে ব্যাচ করে খাওয়া দাওয়া চলছে। মা দেখি কোথা থেকে একটু ঘি আমার পাতে তুলে দিলেন। মায়ের ভালোবাসা বলে কথা। আমার খালাত ভাই একবার আড় চোখে তাকাল- যদি তার পাতে একটু দেওয়া যেত। অন্য সময় হলে তাকে দেবার কোন কথাই হতো না, সেই অল্প একটুকু নিয়েই ঝগড়া করে কুরুক্ষেত্র বানিয়ে দিতাম। কিন্তু মনটা সেদিন খুবই নরম ছিল বলে তার পাতেও একটি তুলে দিলাম।  ওমা! সেও দেখি আবার আমার পাতে তুলে দিয়ে বললো, “তুমিই খাও। বিদেশে এই সব পাওয়া যাবে না।”

কখাটি শুনেই মনে পড়ে গেল আজ বিকেলেই চলে যেতে হবে এই দেশ ছেড়ে। সেদিন মনে হচ্ছিল টাইম মেশিন দিয়ে যদি সময়টাকে থামিয়ে দেওয়া যেত। বিকেলটা কোনোভাবেই যদি না আসতো। সবার আলাদা ভালোবাসা পেয়ে মনে হচ্ছিল আমাকে যেন ফাঁসির আসামি করে পাঠানো হচ্ছে।

দুপুরে বসে ছিলাম আমাদের টিনের বাসার উঠানে থাকা আম গাছের পাশে। ঢাকার বাসাতে এমন আম গাছ! -সবাই খুব অবাক হয়ে আমাদের বাসাটা দেখতো। রাজশাহীর মানুষ বলেই হয়ত আমগাছের প্রতি ছিল আলাদা দুর্বলতা রয়েছে আমার সহ আমাদের সকল আত্মীয় স্বজনদের। কি সুন্দর আম গাছের বাতাসের শব্দ, টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ, আর জোছনার রাতে ছাদের মায়াময় রাত- এত্তসব প্রিয় জিনিসগুলি ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে! মানতেই পারছিলাম না।

তার আগের কয়েকদিন থেকেই আমার ব্যাগ গুছানোর কাজ চলছিল। টিকেটে লেখা আছে ২০ কেজির জিনিস নেওয়া যাবে। আমাদের আত্মীয়কুলের মধ্যে আমিই এইরকম প্রথম স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে যাচ্ছি। আমাদের কারোরই কোন অভিজ্ঞতা নেই জাপানে যাবার। কত বড় ব্যাগ নেওয়া যাবে?- তা নিয়ে আমার বাবা এবং খালু মোটামুটি গবেষণা পর্যায়ে পিএইচডি করতে লেগে গিয়েছিলেন। খালু ইঞ্জিনিয়ার বলে একটা মোটামুটি মাপের খসড়া কাগজ আমাদের হাতে দিলেন।

আমার ও বাবার তখন শুরু হল ব্যাগ কেনার পালা। একবার নিউমার্কেটে যাই, আবার বাইতুল মোকাররমের ব্যাগের দোকানগুলিতে যাই, কিন্তু সেই বড় সাইজের কোন ব্যাগ পাওয়া যায় না। অনেক ঘুরে ঘুরে অবশেষে খালুর দেয়া মাপমতন একটি ব্যাগ পছন্দ হল আমাদের, কিন্তু এত্ত বিশাল সাইজের ব্যাগ দেখে আমারই আক্কেল গুড়ুম। দোকানদার আমাকে ব্যাগটি নিয়ে ক্যাশিয়ারের টাকা দিতে বললেন। আমি ব্যাগটা হাতে নিয়েই অবাক হলাম। ওজনে অনেক ভারি এবং এতবড় যে সেটাতেই আমি ঢুকে যেতে পারবো।ব্যাগের টাকা নেবার জন্য ক্যাশিয়ারে মনে হয় দোকানের মালিক ছিলেন। বাবা বললেন যে স্কলারশিপ নিয়ে জাপানে তার ছেলে পড়তে যাচ্ছে। এদিকে আমি লজ্জাতে মাথা নীচু করে আছি। বাবার দিকে কড়মড় করে তাকিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি, “এদেরকে এত বলার কি  আছে”? কি লজ্জা, কি ভাববে এরা!

দোকানের লোকটি কি বুঝলো জানি না, সেও একটু সম্মান করে কিছু টাকা কম রাখলো। বললো, "আপনার ছেলে তো আমাদের গর্ব, তার জন্য একটু কনসেশন রাখলাম"। বের হওয়ার সময় তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিলেন। বাড়ির বাহিরে কারো বাড়তি ভালোবাসা ও সম্মান সেবারই প্রথম পাওয়া। এর পরে যখনই আমি মানুষের জন্য কাজ করেছি,তখনই মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি।

“মানুষ ধরো মানুষ ভজ শোন বলিরে পাগল মন।

মানুষের ভিতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন।”

বাসায় যখন সেই ব্যাগের দাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন জিতলাম না হারলাম?- তা নিয়ে সবাই তর্ক শুরু করে দিল, কেননা এইরকম বড় ব্যাগ আমাদের গুস্টির মধ্যে কখনই কেনা হয়নি। যাই হোক পরে সবাই একমত হল যে ব্যাগটি আমার জন্য বেশ হয়েছে, অনেক কিছুই সেটিতে ঢুকানো যাবে। বাবা যুদ্ধ জয় করে আসার মতন করে খুশি হলেন। এই সুযোগে চা’য়ের আয়োজন চললো।

এরপরে শুরু হল ব্যাগ গুছানোর পালা। মা-ই সেই কাজটি করছিলেন। জাপানে যাচ্ছি , সেখানে একা থাকতে হবে। কাপড় চোপড়ের পাশাপাশি টুকটাক কিছু রান্নার জিনিসপত্র দিয়ে দিলেন। সাথে দিলেন একটু চাল-ডাল সহ প্রয়োজনীয় কিছু মশলা। সেই ব্যাগের চারিদিকে সবার ভিড়। মনে হচ্ছিল যেন তারাই যাচ্ছেন, আমার কিছু করার অনুমতি নেই।

ব্যাগ গোছানোর পাশাপাশি  বড় খালাতো বোনের উপর দায়িত্ব পড়লো আমাকে বিশেষ রান্নার কোর্স দেয়া। কীসের পরে কি দিতে হবে তা টুকটুক করে নোট নিচ্ছি। এর থেকে অঙ্ক করা অনেক সহজ বলে মনে হতে লাগলো। হলুদ দিতে হবে “পরিমাণ মতন”। কিন্তু সেই পরিমাণটা কি জিজ্ঞাসা করতেই একপালা বকা খেতে হলো। শিক্ষকের সাথে তর্ক করে এটি কেমন ছাত্র। কিন্তু ব্যাপারটা আমার মনঃপূত হল না। এইটা আবার কেমন পরিমাণ! বিনা পারিশ্রমিক বোন আমাকে  এই দুর্লভ কোর্স শেখাচ্ছেন তার প্রতি কৃতজ্ঞ হতেই হবে- তাই বকাগুলি হজম করলাম।

থিওরি ক্লাসের পরে রান্নাঘরে ঢুকে প্রাকটিক্যাল ট্রেইনিংটা করানোর সময়টা উনি পেলেন না বলে- উনার খুবই আফসোস হতে লাগলো। অল্প সময়ের জন্য হলেও প্রাকটিক্যালের জন্য আমাকের রান্নাঘরে  নিয়ে ট্রেইনিং করানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছেন, আবার দেখি আরেক বোন কীভাবে কাপড় কাচতে হবে তার ট্রেইনিং করানোর জন্য আমাকে নিয়ে টানাটানি করা শুরু করলো। একজন ছাত্র - আর তার অনেকগুলি শিক্ষক। আমার যেহেতু কোন বোন ছিল না তাই খালাত-ফুপাত বোনগুলিই আমার আপন বোন এবং তারা সবাই আমার থেকে বড় বলে তাদের কথামতোই চলতে হচ্ছিল। সেই শিক্ষকদের পাল্লায় পড়ে আমার তখন পিষ্ট হওয়ার মতন অবস্থা। তবে তাদের ভালোবাসা খুব উপভোগ করছিলাম। আহা! তারা এত ভালোবাসে তা আগে টের পাইনি।

যাই হোক সমস্যা বাঁধলো ব্যাগের ওজন এক কেজি বেড়ে গেছে। সব আত্মীয় স্বজনরা আমার ব্যাগের চারিদিক ঘিরে বসে আছে। সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে খুঁজছে কোন অতিরিক্ত জিনিসটা বের করা যায়। পাশের বাসা থেকে ওজন মাপার যন্ত্র নিয়ে আনা হয়েছে ব্যাগটি ওজন করানোর জন্য। একটু পরপর ওজন মাপা হচ্ছে, কিন্তু কোনোভাবেই এক কেজি কমছে না। যন্ত্রটি কথা বলতে পারেনা বলে হাফ ছাড়লাম। যদি কথা বলতে পারতো তবে আমাদের অত্যাচারে বেচারা মনে হয় কান্না কাটি করতো। যন্ত্রটিকে পুরুষ লিঙ্গ ব্যবহার করলাম যদিও ফ্রেঞ্চ ভাষাতে তা হবে স্ত্রী লিঙ্গ।

অনেক গবেষণার পরে সবাই একমত হল যে কিছু চাল বের করে ফেলা যায়। সেই সময়ে মোটা কাগজের প্যাকেটে খোলা চাল বিক্রি হতো। ব্যাগের নীচ থেকে চাল বের করতে গিয়ে বেচারা কাগজের প্যাকেটটি গেল ছিড়ে। সেই চাল ছড়িয়ে পড়লো পুরো ব্যাগ জুড়ে। কাজটার দোষ কার উপর দেয়া যায়? ছোট ভাইটি ব্যাগে হাত দিয়ে পাশেই বসে ছিল, আমি তার উপরই দোষটি দিয়ে দিলাম। বেচারা সবার বকা খেয়ে দিল এক কান্না। পরে তাকেই ঠান্ডা করার জন্য হৈচৈ বেধে গেল।

অনেক কষ্টে সব ঠান্ডা হলে ব্যাগটা গোছানো শেষ হলে লক করা হল। এরপরে দেখি মা শাড়ি দিয়ে চোখ ঢেকে বসে আছে। শুরু হল তার কান্নার পালা। শুনেছি হাসি নাকি সংক্রামক রোগ। সেটি মিথ্যে প্রমাণ করে সবার মধ্যেই কান্নার সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়লো দেখি সবাই শুরু করে দিল কান্না। পুরো ঘরটা থমথমে অবস্থা। আমি মাথা নীচু করে বসে আছি। টুপটুপ করে চোখের পানি ফেলছি, তা পড়ছে পায়ের আঙ্গুলে। একটু পরে দেখি সব আঙুলগুলি ভিজে গেছে।

পরের দিন আমাকে এয়ারপোর্টে নিয়ে যাবার জন্য বাবা একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করলেন। সেটিতে উঠতে গিয়ে কে সামনে বসবে কে পিছনে বসবে তা নিয়ে শুরু হল গন্ডগোল। সেই হৈচৈ এর মধ্যে খেয়াল হল যে ব্যাগটাই ঢুকানো হয়নি। আবার সবাইকে হৈচৈ করে গাড়ি থেকে  নামানো হল। গাড়ি থেকে নামতে যেয়ে খালাতো ভাই মাথায় বাড়ি খেয়ে আহত হোল। তাকে নিয়ে আবার হৈ চৈ। একজন পানি নিয়ে আনে, আরেকজন বরফ নিয়ে আনে। সেই পানিতে তার কাপড় ভিজে গেল। পানিটা পড়লো প্যান্টের বিশেষ একটি জায়গায় যার কারণে সে লজ্জায় চুপচাপ গাড়ির কোনায় বসে গেল। ব্যাগটা ঢুকিয়ে আবার সবার ঢুকার পালা। এইবার দেখা গেল দরজাটি আর লাগানো যাচ্ছে না। অনেক কষ্টে আবার বসার জায়গা ঠিক করে আমরা রওনা দিলাম এয়ারপোর্টের দিকে।